ফুরিয়ে আসছে গ্যাস

বর্তমানে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ রয়েছে ১৪ দশমিক ৩২ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট)। আর গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা প্রায় এক টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট)। কিন্তু বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় গ্যাস উত্তোলন ও বিতরণ করা হয় তাতে বার্ষিক ঘাটতি থাকে অন্তত এক হাজার ৮২৫ কোটি ঘনফুট। এ তথ্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং পেট্রোবাংলা সূত্রের। উত্তোলন ও ব্যবহারের হার একইমাত্রায় থাকলে ২০৩১ সাল পর্যন্ত মজুদ গ্যাস ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু দেশের শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জ্বালানি চাহিদা। ক্রমবর্ধমান গ্যাস-জ্বালানির চাহিদা ও মজুদের হিসাব কষে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৯ সালেই গ্যাস সংকটে পড়বে দেশ। তাই এ বিষয়ে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

 
এই অবস্থায় গ্যাস আমদানি ও বিদ্যমান গ্যাসের সাশ্রয়ী ব্যবহারে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। তবে দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার বা সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোতে কতটুকু গ্যাস থাকবে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও অস্পষ্টতা রয়েছে। তাই বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র কিংবা সেগুলোতে মজুদ গ্যাসের উপর নির্ভর করে অপেক্ষা করা উচিত হবে না। তাই বিদ্যমান গ্যাসের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত এবং অপব্যবহার দূর করতে হবে। তবে বিপুল জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য গ্যাস আমদানির বিকল্প নেই।
 
প্রসঙ্গত, দেশের মোট প্রাথমিক প্রাক্কলিত গ্যাস মজুদের পরিমাণ ৩৮ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। প্রায় ১৩ টিসিএফ গ্যাস ব্যবহূত হয়েছে। গ্যাসের সিংহভাগ ব্যবহার করা হয় বিদ্যুত্ উত্পাদন, সার কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে। উত্তোলিত গ্যাসের ১০ ভাগের বেশি ব্যবহূত হচ্ছে আবাসিক খাতে।
 
বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে এটি সত্যি। যেভাবে জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে, তাতে চার বছর পরই চাহিদা ও জোগানে বড় ভারসাম্য তৈরি হবে। তবে এ বিষয়ে সরকার সচেতন। নতুন মজুদ তৈরি করতে সমুদ্রে ও স্থলে গ্যাস অনুসন্ধান পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে মজুদও বাড়বে। আর গ্যাস আমদানির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যত্ চাহিদা মোকাবেলায় গ্যাসের সাশ্রয়ী ব্যবহার ও গ্যাস আমদানির ব্যাপারে সরকার সচেষ্ট রয়েছে।
 
ফুরিয়ে আসছে গ্যাসের মজুদ
 
সম্প্রতি পেট্রোবাংলার এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাসের বর্তমান মজুদ দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য খুবই অপ্রতুল। শিল্প ও বিদ্যুত্ খাতের উন্নয়নের জন্য গ্যাসের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। নতুন করে গ্যাস পাওয়া না গেলে পরিস্থিতি নাজুক হবে। গ্যাস ব্যবহারের হার একইমাত্রায় থাকলেও বর্তমানে মজুদকৃত গ্যাস আগামী ২০৩১ সাল পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। দেশের আবিষ্কৃত ২৬টি ও উত্পাদনে থাকা ২০টি গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ হিসাব পর্যালোচনা করে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গ্যাস মজুদ রয়েছে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে। এই ক্ষেত্রে আবিষ্কৃত গ্যাসের মজুদ প্রায় ৪ টিসিএফ। এর পরে আছে তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রে, আড়াই টিসিএফ গ্যাস।
 
জ্বালানি ও খনিজ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুদ পর্যায়ক্রমে ফুরিয়ে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে অবস্থিত সেমুতাং গ্যাস ফিল্ডের ছয়টি কূপের মধ্যে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে মাত্র একটি কূপ থেকে। এটি থেকে দৈনিক মাত্র ৩ মিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। শুরুর দিকে এ কূপ থেকে দৈনিক ১৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছিল। আগামী দুই বছরের মধ্যে এ কূপটি পরিত্যক্ত হতে পারে। সাঙ্গু-১১ গ্যাস ক্ষেত্রটির মজুদ ফুরিয়ে গেছে ২০১৩ সালে। গত জুনে জাতীয় সংসদে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জানান, সুন্দলপুর ও শ্রীকাইলে ১৯৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ রয়েছে। বর্তমানে সুন্দলপুর থেকে দৈনিক ৪ দশমিক ২ এমএমসিএফ এবং শ্রীকাইল থেকে দৈনিক ৪০ এমএমসিএফ গ্যাস উত্তোলিত হচ্ছে। এ বছরের মার্চ থেকে বেগমগঞ্জ গ্যাস ক্ষেত্র থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৫ এমএমসিএফ গ্যাস উত্তোলিত হচ্ছে। রূপগঞ্জ গ্যাস ফিল্ড শিগগিরই উত্পাদনে আসবে।
 
বাড়ছে ঘাটতি
 
পেট্রোবাংলা জানায়, বর্তমানে সরবরাহকৃত গ্যাসের দৈনিক ৪১ শতাংশ বিদ্যুত্ খাতে, ১৭ শতাংশ ক্যাপটিভ পাওয়ারে, ১৭ শতাংশ শিল্প-উত্পাদনে, ৮ শতাংশ সার কারখানায়, ৫ শতাংশ সিএনজি খাতে, ১১ শতাংশ আবাসিক খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা হবে চার হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ঐ সময় শুধু বিদ্যুেকন্দ্রেই দৈনিক দুই হাজার ৯৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে। ২০১৯ সাল নাগাদ গ্যাসের ঘাটতি এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ছাড়িয়ে যাবে।
 
এলএনজি গ্যাস আমদানির উদ্যোগ
 
গ্যাস ঘাটতি মোকাবেলা ও ভবিষ্যতে এ জ্বালানির জোগান দিতে এলএনজি (তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির দিকে ঝুঁকছে সরকার। গত জুনে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনসহ এলএনজি গ্যাস আমদানির কার্যক্রম চলমান আছে। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে এলএনজি আমদানি করে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
 
সম্প্রতি কক্সবাজারের মহেশখালিতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে সিঙ্গাপুরভিত্তিক অ্যাস্ট্রা অয়েলের সাথে চুক্তি করেছে পেট্রোবাংলা। নির্মাণ শেষ হওয়ার পর ১ লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার এলএনজি ধারণক্ষমতার এ টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হবে। এ টার্মিনাল থেকে সরাসরি চট্টগ্রামের গ্রিডে এলএনজি দেয়া হবে। এখান থেকে দেশের অন্য এলাকায়ও এলএনজি সরবরাহ করা যাবে। যেহেতু দেশের বেশিরভাগ এলাকায় গ্যাস সঞ্চালন পাইপ লাইন রয়েছে তাই এলএনজি সরবরাহ করাও সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নসরুল হামিদ বিপু বলেন, এলএনজি গ্যাস টার্মিনালটি নির্মাণ শেষ হতে আরো অন্তত ১৮ মাস সময় লাগবে। এ গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হলে জ্বালানি চাহিদা মেটানোর বড় পথ খুলবে।
 
এ ছাড়া বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডও (পিডিবি) মহেশখালীতে আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
 
মিয়ানমারের দিকেও দৃষ্টি
 
এদিকে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকেও গ্যাস আমদানির চেষ্টা করছে সরকার। গত মার্চে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহি চৌধুরী মিয়ানমারে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রীর সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে গ্যাস আমদানি নিয়ে আলোচনা করেন। এ প্রসঙ্গে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিব মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, মিয়ানমার সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা দেশটির জ্বালানি মন্ত্রীর সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে গ্যাস আমদানির বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। গ্যাস আমদানির বিষয়টিকে আরও এগিয়ে নিতে আলোচনা চলছে। তিনি জানান, মিয়ানমার থেকে বর্তমানে চীন ও ভারতে গ্যাস রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়া থাইল্যান্ডেও গ্যাস রপ্তানির প্রক্রিয়া চলছে। এই পর্যায়ে দেশটি আমাদের চাহিদার কতটুকু গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের কাছে আমাদের আগ্রহ ও চাহিদা জানানো হয়েছে। তাদের পরবর্তী গ্যাস রপ্তানি এজেন্ডায় বাংলাদেশকে রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।
 
আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগে নিরুত্সাহ
 
গ্যাসের ঘাটতি দূর ও সিস্টেম লস রোধে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে। ২০০৯ সালের ১ অক্টোবর থেকে সিলেট অঞ্চল ছাড়া সারা দেশে নতুন শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগ প্রদান বন্ধ করে সরকার। পরে ২০১০ সালের ১৩ জুলাই নতুন আবাসিক সংযোগ প্রদানে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। পরে ২০১৩ সালের মে মাসে সরকার আবাসিক খাতে আবারো গ্যাস সংযোগ উন্মুক্ত করে। কিন্তু আবাসিক এলাকাতে গ্যাসের অপচয় হয় এই বিবেচনায়, গত এপ্রিল থেকে আবারো সীমিত আবাসিক সংযোগের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। নসরুল হামিদ বিপু বলেন, আবাসিক খাতে গ্যাস ব্যবহারে অনেক অপচয় হয়। তাই গ্যাসের আবাসিক ব্যবহার নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীও তার সর্বশেষ বাজেট বক্তৃতায় বলেন, নীতিগতভাবে একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যে গৃহস্থালির কাজে ব্যবহারের জন্য গ্যাস সরবরাহ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। গ্যাস অনুসন্ধান, উত্কলন, আমদানি, বিতরণ এবং ব্যবহার বিষয়ে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা খুবই জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ।