মসজিদের নামে বরাদ্দকৃত টিআর প্রকল্পের চাল বিক্রির টাকায় কেনা সোলার প্যানেল বসেছে উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামে এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে। আবার রাস্তা সংস্কারের কোন কাজ না করেই সেই টাকায় কেনা সোলার প্যানেল বসিয়েছেন একই উপজেলার সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।
সম্প্রতি বগুড়ার ধুনট উপজেলায় গিয়ে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি (কাবিখা), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) ও টেস্ট রিলিফ (টি.আর) প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র পাওয়া গেছে। উপরোক্ত ঘটনা দুটি তারই খণ্ড চিত্র। দেখা গেছে, প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা সরকারি দলের নেতাকর্মী। যার কারণে সহজেই তারা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ নিয়ে নামসর্বস্ব কাজ দেখিয়ে বেশির ভাগ টাকা আত্মসাত্ করেছে।
উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নের রঘুনাথপুরে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি জহুরুল ইসলাম তালুকদারের বাড়ির চালে রয়েছে একটি সোলার প্যানেল। অথচ এই সোলারটি রঘুনাথপুর তালুকদারবাড়ি জামে মসজিদে বসানোর কথা ছিল। অনুসন্ধানে জানা যায়, তালুকদারবাড়ি জামে মসজিদের নামে টিআর প্রকল্পের দু’টন চাল বরাদ্দ ছিল। উক্ত বরাদ্দ থেকে মসজিদে একটি সোলার প্যানেল স্থাপন করে অবশিষ্ট অর্থে মসজিদের সংস্কার কাজ করার কথা। কিন্তু প্রকল্পের সভাপতি জহুরুল ইসলাম তালুকদার মসজিদের কোন কাজ তো করেননি বরং একটি সোলার ক্রয় করে নিজের বাড়িতে স্থাপন করেছেন।
বিষয়টি জানার পর মসজিদ কমিটির সদস্য সোহরাব আলী, শফিকুল ইসলাম, ডা. দেলবর আলী, মজনু মিয়া ও রফিকুল ইসলামসহ গ্রামের অনেকেই সোলারটি মসজিদে স্থাপন করার জন্য সভাপতির নিকট দাবি জানান। কিন্তু জহুরুল ইসলাম সোলারটি মসজিদে ফেরত না দিলে দু’পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক ও বিরোধ শুরু হয়। একপর্যায়ে গ্রামের লোকজন নতুন একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক পুরাতন মসজিদের মাত্র ৬০ মিটার দূরে আরেকটি মসজিদ দ্রুত নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে গ্রামের বেশির ভাগ লোক নতুন মসজিদে জুমার নামাজসহ ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করছেন। এ বিষয়ে প্রকল্পের সভাপতি জহুরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, প্রকল্পটি নিতে আমি পকেট থেকে ১৫/১৬ হাজার টাকা খরচ করেছি। তাই সোলারটা আমি আমার বাড়িতে বসিয়েছি।
একই উপজেলায় টিআর, কাবিখা, কাবিটা প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের আরো ঘটনা জানা গেছে। ধুনট সদর ইউনিয়নের পাকুড়িহাটা মসজিদ থেকে ইছাহাকের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের জন্য চার টন চাল বরাদ্দ হয়। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব এসএম মাসুদ রানা নিজেই উক্ত প্রকল্পের সভাপতি। চেয়ারম্যানের বাড়িতে যাতায়াতের ইট বিছানো এই রাস্তায় মাটির কোন কাজ নেই। অথচ তিনি ভুয়া প্রকল্প দিয়ে রাস্তা সংস্কারের কোন কাজ না করে বরাদ্দের চাল বিক্রির টাকা দিয়ে একটি সোলার ক্রয় করে নিজের বাড়িতে স্থাপন করেছেন। এছাড়াও আরো ২টি প্রকল্পের ২টি সোলার নিজের বাড়িতে স্থাপন করেছেন। এ প্রসঙ্গে আলহাজ্ব এসএম মাসুদ রানা ইত্তেফাককে বলেন, আমার বাড়িতে লাগানো সোলার পরবর্তীতে গ্রামের দরিদ্র লোকদের বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া প্রকল্পের কাজও শেষ করা হয়েছে।
উপজেলার অন্যান্য প্রকল্পের চিত্রও প্রায় একই রকম। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ধুনট উপজেলায় কাবিখা (সাধারণ) প্রকল্পে ২ কিস্তিতে ২৫৮ টন, কাবিখা (বিশেষ) ২৪৬ টন, টিআর (সাধারণ) ১০৮ টন, টিআর বিশেষ ১৪৪ টনসহ মোট ৭৪৬ টন চাল/গম বরাদ্দ হয়। যার অনুকূলে ১৭৯টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। তাছাড়া কাবিটা সাধারণ ও বিশেষ প্রকল্পে ৫ কিস্তিতে বরাদ্দকৃত ৮৪ লাখ টাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ রাস্তা সংস্কারের জন্য ১২৭টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। যে প্রতিষ্ঠানেই বরাদ্দ দেয়া হোক না কেন প্রকল্পের সভাপতি বা মূল দায়িত্বে থাকে ওই এলাকার সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা। ফলে তারা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ নিয়ে নামসর্বস্ব কাজ দেখিয়ে বেশির ভাগ টাকাই আত্মসাত্ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রকল্পগুলোতে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে ধুনট উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রিয়াজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দকৃত খাদ্যসামগ্রী ও টাকা তামাদিযোগ্য। দেরিতে এসব প্রকল্পের বরাদ্দ পাওয়ায় দ্রুত কাজ শেষ করতে হয়েছে। তাই জনবল কম থাকায় সবগুলো প্রকল্প ঠিকমত তদারকি করা সম্ভব হয়নি। তারপরও মোটামুটি কাজ হয়েছে বলে তিনি জানান।