বেপরোয়া সুন্দরবনের বাঘ শিকারি

কোনোভাবেই দমানো যাচ্ছে না সুন্দরবনের বেপরোয়া বাঘ শিকারীদের। মাত্র দশ মাসের ব্যবধানে বাঘের ৯টি এবং হরিণের ৫৫টি চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ৭ আগস্ট নগরীর নতুনবাজার লঞ্চঘাট থেকে ৬৯টি বাঘের হাড় এবং গত রবিবার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের চরামুখা গ্রামে অভিযান চালিয়ে সদ্য হত্যা করা তিনটি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়। এভাবে একের পর এক বাঘ ও হরিণ শিকারের ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সুন্দরবন বিশেষজ্ঞরা। 

 
বাংলাদেশের মানুষের গর্ব সুন্দরবন আর সুন্দরবনের বাঘ। নয়নাভিরাম এই বনের বাঘ ও হরিণ চোরা শিকারীদের টার্গেট। শিকারীদের রাইফেলের গুলির মুখে সুন্দরবনের কালো-হলুদের ডোরা কাটা এই বাঘের অস্তিত্ব এখন প্রায় বিলীন। বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা এখন সর্বসাকুল্যে ১০৬। আর বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে পুরো সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১৭০টি। গত এক দশকে এই সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। ক্যামেরা পদ্ধতিতে সুন্দরবনের বাঘ গণনা জরিপ-২০১৫র ফলাফলে এ তথ্য জানা গেছে। এ জরিপের ওপর ভিত্তি করে ‘বাংলাদেশের সুন্দরবনের বাঘের ঘনত্ব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাঘের অস্তিত্ব রক্ষায় অন্যতম হুমকি মানুষের অপতত্পরতা। গত বছরের ১৬ অক্টোবর বাঘের দুইটি চামড়াসহ ৬ শিকারীকে আটক করা হয়। এরপর চলতি বছর ১৩ জানুয়ারি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে বাঘের একটি চামড়াসহ ৩ শিকারীকে আটক করে র্যাব। গত ৩ ফেব্রুয়ারি বরগুনার পাথরঘাটা থেকে হরিণের ৩৬টি চামড়াসহ দুইজন এবং বাগেরহাটের শরণখোলা থেকে হরিণের একটি চামড়াসহ আটক হয় একজন। ৫ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা থেকে বাঘের চামড়াসহ আটক করা হয় একজনকে। ২০ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ইকড়ি বাজার থেকে বাঘের একটি চামড়া ও হরিণের ১৪টি চামড়াসহ দুই জনকে আটক করে র্যাব। ২৪ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা এলাকা থেকে বাঘের একটি এবং হরিণের চারটি চামড়াসহ তিনজনকে আটক করা হয়।
 
খুলনা থানা পুলিশ গত ৭ আগস্ট নগরীর নতুনবাজার লঞ্চঘাট থেকে বাঘের ৬৯টি হাড়সহ দুই যুবককে আটক করে। আটক এনায়েত হোসেন ও বাবু জানায়, সুন্দরবনের কোকিলমুনি এলাকায় বাঘের এই হাড়গুলো মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা ছিল। সর্বশেষ গত রবিবার ভোর রাতে পুলিশ কয়রা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের চরামুখা গ্রাম থেকে বাঘের তিনটি চামড়াসহ ৬ বাঘ শিকারীকে আটক করে। পরে তারা পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। নিহত ৬ বাঘ শিকারী বনদস্যু ইলিয়াস-জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্য। কয়রা থানার ওসি হরেন্দ্রনাথ সরকার জানান, বাঘের চামড়া তিনটি কাঁচা। কয়েকদিন আগে এ তিনটি বাঘ হত্যা করা হয়েছে বলে তাদের ধারণা।
 
বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত চোরা শিকারীদের হাতে ১৫টি বাঘ নিহত হয়েছে। এছাড়া ২০১২ সালের ১১ জুন পাচারের সময় উদ্ধার করা হয়েছে তিনটি বাঘের বাচ্চা। অপরদিকে, খুলনা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ বছরে সুন্দরবন ও এর আশপাশ এলাকায় ৫২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে ২৪টি বাঘকে পিটিয়ে ও ১৭টি বাঘকে চোরা শিকারীরা কৌশলে হত্যা করেছে। ২০১২ সালের ৬ নভেম্বর বাগেরহাটের মংলার ঢাংমারিতে একটি বাঘ হত্যা করা হয়। এরপর বাঘের চারটি বড় দাঁত (ক্যানাইন) চার লাখ টাকায় বিক্রির চেষ্টা করে পাচারকারীরা। এ সময় র্যাব সদস্যরা বাঘের ৩টি দাঁতসহ দুই জনকে আটক করে।
 
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাগেরহাটের শরণখোলা থেকে পাচারের সময় ৪টি বাঘের মাথা, ৩টি চামড়া ও ৩২ কেজি হাড় উদ্ধার হয়। ২০০৯ সালের ২৬ আগস্ট খুলনা মহানগরীর ময়লাপোতা মোড় থেকে র্যাব সদস্যরা বাঘের চামড়াসহ চারজনকে আটক করে। এছাড়া ওই বছরের ৯ ও ৩১ ডিসেম্বর মংলার ঢাংমারী থেকে তিনটি দাঁতসহ দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়।
 
ব্যাপক চাহিদা থাকায় শিকারীরা বাঘের মাংস, হাড়, দাঁত ও চামড়া এবং হরিণের চামড়া চীন ও তাইওয়ানসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করে। তবে মাঝে-মধ্যে চামড়া বহনকারীরা ধরা পড়লেও চোরা শিকারী ও ক্রেতারা রয়ে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। প্রতিটি বাঘের চামড়া বিক্রি হয় ২ থেকে ৩ লাখ টাকায়। আর হরিণের চামড়া বিক্রি হয় ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকায়। অভিযোগ রয়েছে- সুন্দরবনে একের পর এক বাঘ শিকার হলেও তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না বন বিভাগ। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, সুন্দরবনের বাঘ ও হরিণ এখন বিলুপ্তির পথে। সম্প্রতি বাঘ-হরিণের বেশ কয়েকটি চামড়া উদ্ধার হলেও অধিকাংশ শিকারের ঘটনা প্রশাসনের নজরে আসছে না। সুন্দরবন ও সুন্দরবনের বাঘ-হরিণ বাঁচাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
 

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জহির উদ্দিন আহমেদ ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাঘ-হরিণের চামড়া উদ্ধারের পর সুন্দরবনে বন বিভাগের টহল জোরদার করা হয়েছে। বন বিভাগের পাশাপাশি বাঘ-হরিণ শিকারী ও বনদস্যুদের গ্রেফতারের জন্য র্যাব, পুলিশ ও কোস্টগার্ডও অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এই অভিযানের কারণেই তিনটি বাঘের চামড়া উদ্ধার এবং বন্দুকযদ্ধে ছয়জন বাঘ শিকারী নিহত হয়েছে।