ভালো নেই চলনবিলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ

বর্ষা মৌসুমে চলনবিলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের হাতে কাজ না থাকায় চলছে না সংসার। অনাহারে-অর্ধাহারে অপুষ্টিতে ভুগছে তারা। জীবন বাঁচাতে অনেকেই মহাজনী ঋণ ও আগাম শ্রম বিক্রি করছে। আবার কেউ কেউ ঝাড়ু ও খেজুর পাতার পাটি তৈরি ও বিক্রি করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছে। এভাবে কষ্টে বেঁচে রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার নারী-পুরুষ-শিশু । 

 
নেতাদের দাবি, বর্ষাকালে অবহেলিত এই জনগোষ্ঠীকে ভিজিডি, ভিজিএফ, বয়স্ক ভাতার সুবিধা প্রদানসহ বিশেষ কর্মসূচির আওতায় এনে পুনর্বাসন করা। অন্যথায় এ জনগোষ্ঠীর মানুষ অভাব মেটাতে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাদের সংগঠনের নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চলনবিলের গুরুদাসপুর, সিংড়া, তাড়াশ, রায়গঞ্জ উপজেলায় এদের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করে। এদের মধ্যে উড়াও, মাহাতো, রাজবংশী ও বিদাস, কনকদাস ও স্বল্পসংখ্যক সাঁওতাল নারী-পুরুষ রয়েছে। এক সময় এসব সম্প্র্রদায়ের নারী-পুরুষ বনজঙ্গলে ঘুরে শিয়াল, খরগোশ, বেজি, কচ্ছপসহ নানা ধরনের প্রাণী নিধন করতো। সময়ের ব্যবধানে বন-বাদাড় উজাড় হয়ে পড়ায় তাদের জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
 
পরে তারা ধান লাগানো ও কাটা, মাড়াই, ইটভাটায় শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহের পথ বেছে নেয়। কঠোর পরিশ্রমী, সহজ-সরল আর অপেক্ষাকৃত কম দামে পাওয়ায় এ অঞ্চলে এদের চাহিদা অনেক বেশি। হেমন্ত ও শরতে তাদের নিজ এলাকায় কাজ থাকে না। এ সময় মাঠে পাকা ধান কিংবা ইটভাটায় ইট তৈরির কাজ এবং কৃষকের বাড়িতে শ্রমিকের কাজ থাকে না। এ অঞ্চলের ৮০-৮৫ ভাগ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্য কৃষি শ্রমজীবী। কৃষিশ্রম বিক্রি করেই তাদের সংসার চালাতে হয়। কাজ না থাকায় অর্থ সংকটে পড়ে বর্তমানে তারা আগাম শ্রম বিক্রি শুরু করেছে।
 
চলনবিলে গিয়ে দেখা গেছে, এদের নারীরা চলনবিলের মাঠ থেকে বিন্নার ফুলকা, আবার কেউ কেউ গাছ থেকে খেজুরের পাতা সংগ্রহ করছে। ওই দলের অনিমা উড়াও ও রুপালী কেরকাটা জানায়, তাদের বাড়ি তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর গ্রামে। তাদের কাজ না থাকায় জীবিকা হিসেবে এগুলো সংগ্রহ করছে। বাড়িতে নিয়ে ঝাড়ু ও খেজুর পাতার পাটি তৈরি করে বিক্রির পর চালসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনবে। খুঁটিগাছা গ্রামের সুবোধ মাহাতো জানান, ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক মাসে তাদের কোনো কাজ থাকে না। এ সময় অর্থ সংকটে পড়ে অল্প দামে আগাম শ্রম বিক্রি করতে হয় কিংবা চড়া সুদে টাকা নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
 
তাড়াশের মাধাইনগর ইউনিয়নের ‘পৌষার আদিবাসী উচ্চ বিদ্যালয়ের’ প্রধান শিক্ষক শ্যামসুন্দর মণ্ডল জানান, এখন হাতে কাজ না থাকায় এসব নারী-পুরুষ অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে বোরো ধান লাগানো, কাটা এবং ইটভাটার ইট তৈরি ও গৃহস্থের বাড়িতে কৃষি শ্রমিকের কাজ করতে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে। এজন্য তারা ওই সকল কাজ করার জন্য দিন হাজিরা ১৫০-২০০ টাকায় আগাম শ্রম বিক্রি করছে। অনেক গৃহস্থ, ইটভাটার মালিক তাদের আগাম শ্রম কিনছেন। অথচ ভরা মৌসুমে মজুরি থাকে ৩০০-৩৫০ টাকা।
 
তাড়াশ সদর ইউনিয়নের কাউরাইল গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নান জানান, ভরা মৌসুমে বোরো লাগাতে ৩৫০-৪৫০ টাকা মজুরি দিতে হয়। এখন বর্ষাকাল হওয়ায় মজুরি হিসেবে এসব শ্রমিক  ১৫০-৩০০ টাকা হিসেবে আগাম শ্রম বিক্রির টাকা নিয়ে যাচ্ছে।
 
আদিবাসী ফাউন্ডেশনের (তাড়াশ) সভাপতি খগেন্দ্রনাথ মাহাতো জানান, তাড়াশ এডিপি ওয়ার্ল্ড ভিশন নামে একটি বেসরকারি সংস্থা আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে হাঁস-মুরগি, ছাগল, গাভী পালন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ কর্মকাণ্ডের জন্য বিভিন্ন ধরনের অনুদান ও ঋণ প্রদান করতো। কিন্তু গত বছরপাঁচেক ধরে এনজিও নির্ভর সহযোগিতা অনেকটা বন্ধ হওয়ার কারণে এসব নর-নারীর আগাম শ্রম বিক্রি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কষ্টে কাটছে তাদের দিন।