সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের আহ্বান

রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও ক্রিয়াশীল করার লক্ষ্যে এবং রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে সংবিধান সংস্কার অপরিহার্য বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনরা। এজন্য সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ আয়োজিত ‘পূর্ণ গণতন্ত্রের জন্য ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তারা এই আহ্বান জানান।
 
আলোচনার শুরুতে আয়োজক সংগঠনের পক্ষে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ব্যারিস্টার মঞ্জুর আহসান। প্রবন্ধের সূচনা করা হয় গণপরিষদের শেষ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া ভাষণের ‘আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র এবং সেই শোষিতের গণতন্ত্রের অর্থ হল, আমার দেশে যে গণতন্ত্রের বিধিলিপি আছে, তাতে যেসব প্রভিশন করা হয়েছে, যাতে এ দেশের দুঃখী মানুষ প্রটেকশন পায়, তার জন্য বন্দোবস্ত আছে-ঐ শোষকেরা যাতে প্রটেকশন পায়, তার ব্যবস্থা নাই’- এই বক্তব্য দিয়ে।
 
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সংগঠনের আহ্বায়ক ও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. এ টি এম শামসুল হুদা বলেন, যে সরকারই ক্ষমতায় আসছে, তারা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে নজর দেয় না, গত চারটি সরকারের অভিজ্ঞতায় এটি দেখা গেছে। এসব সরকার যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়েছে।                আলোচনা শেষ উপসংহার টানতে গিয়ে সাবেক এই সিইসি বলেন, সংবিধানে প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের উপরের লোকগুলোর নিয়োগের বিষয়ে আইন করার কথা বলা আছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি), সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন-এগুলোর বেলায়। কিন্তু কত সরকার এলো-গেলো, কেউ সেই আইন করেনি। আমি যখন নির্বাচন কমিশনে ছিলাম, তখন নির্বাচন কমিশন কীভাবে গঠিত হয়-১৬টি দেশের আইনকানুন দেখে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের পর সরকারকে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সেটি হিমাগারে চলে যায়।
 
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম. হাফিজউদ্দিন খান বলেন, যেখানে রাষ্ট্রপতির চাকরিই নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রীর ওপর, সেখানে তাকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা দিয়ে লাভ কী? সংবিধানে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হলেও এই ক্ষমতা প্রয়োগে তাকে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হয়।
 
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, ১৯৯১-পরবর্তী অভিজ্ঞতায় দেখা যায়-সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর যে ক্ষমতা দেয়া আছে, তার চর্চা বা প্রয়োগ হচ্ছে না। জাতীয় সংসদ ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি বড় জায়গা হলেও বিরোধী দল সংসদে তার যথার্থ ভূমিকা রাখছে না। যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে না, সেগুলো কীভাবে কার্যকর করা যায়, সে চেষ্টাই আগে করতে হবে। এরপর নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির চেষ্টা করতে হবে।
 
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, রাষ্ট্রপতির পদটি এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ দেয়াটাই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা। কিন্তু এ দুটো ক্ষমতা অনেকটা স্বয়ংক্রিয় কাজ। কারণ, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ লাভ করবেন, এটিই স্বাভাবিক। আর নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করবেন, এটিও অনেকটা স্বয়ংক্রিয় বিষয়।
 
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, দেশে জেলা প্রশাসকদের ক্ষমতা এখন রাজা বা রাজপ্রতিনিধির ক্ষমতার মতো হয়ে গেছে। একজন জেলা প্রশাসকের ৬০২টি ক্ষমতা থাকে। তিনি ২০০ কমিটির সভাপতি। একইভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও ৩৮টি ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার আগ্রহই তাদের বেশি থাকে।
 
‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, রাজনীতিবিদ ছাড়া রাজনীতি বা গণতন্ত্র নিয়ে কারও কথা বলার অধিকার নেই। সংবিধানের পরিবর্তন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রিয়াশীল করতে না পারলে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য আসবে না। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের অভিমত, উদ্বিগ্ন নাগরিকেরা আজ যে উদ্যোগ নিলেন, তার ফল হয়তো তারা দেখে যেতে পারবেন না। কিন্তু উত্তরসূরি উদ্বিগ্ন নাগরিকেরা হয়তো এটা দেখতে পাবেন।
 
গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কিছু খারাপ বিষয় থাকতে পারে। কিন্তু সবকিছুর পরেও অনেক রাজনীতিবিদ দেশপ্রেমিক এবং দেশের জন্য তারা কাজ করতে চান।
 

মূল প্রবন্ধে ব্যারিস্টার মঞ্জুর আহসান বৃহত্তর ইলেক্টোরাল কলেজ ব্যবহার করে সরাসরি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য নির্বাচন ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, সংসদ বিলুপ্ত করার ক্ষমতা ছাড়া রাষ্ট্রপতির ওপর অধিক ক্ষমতা ন্যস্ত করা উচিত। এছাড়া একই ব্যক্তির বহুবিধ ভূমিকা-প্রধানমন্ত্রীর সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধানের পদ এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে কিছু বাধা নিষেধ সাপেক্ষে সংসদ সদস্যদের ফ্লোর ক্রসিং করতে দেয়া উচিত।