ঢাকায় অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরের নিরাপত্তাহীনতায় উদ্বেগ বাড়ছে যাত্রীদের। গত মঙ্গলবার গুলিভর্তি পিস্তলসহ এক যাত্রী নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হয়েছে। পরে যাত্রী নিজেই তার কাছে থাকা পিস্তলের কথা জানালে বিষয়টি নানা আলোচনার জন্ম দেয়। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দুর্বলতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাইগামী একটি ফ্লাইটের ছিনতাই চেষ্টার ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ বিমানের ওই ফ্লাইটটি চট্টগ্রাম অবতরণ করে এবং যাত্রীরা নিরাপদে এয়ারক্রাফট থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ইস্যুটি সামনে চলে আসে। এর কয়দিনের মাথায় মঙ্গলবারের ঘটনা ঘটল।
সূত্র জানায়, নভো এয়ারের একটি ফ্লাইটে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন চিত্রনায়ক ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তার লাইসেন্সকৃত অস্ত্র সঙ্গেই ছিল। নাইন এম এম পিস্তল আর দশটি গুলি ছিল তাতে। তিনি অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের প্রথম স্ক্যানার পার হয়ে গেলেও পিস্তলটি শনাক্ত হয়নি। পরে বিষয়টি তিনি নভো এয়ারের বুকিং কাউন্টারে গিয়ে জানান এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় পিস্তলটি বহনের ব্যবস্থা করেন। স্ক্যানারে পিস্তল ধরা না পড়ার বিষয়টি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। যদিও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। পরে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন এবং ফজলের রহমান নামে একজন নিরাপত্তা কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করে কর্তৃপক্ষ।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য (নিরাপত্তা) শাহ ইমদাদুল হক জানান, দুই ধাপে বিমানবন্দরে নিরাপত্তা চেকিং হয়ে থাকে। প্রথম ধাপই চূড়ান্ত নয়। কাজেই দ্বিতীয় ধাপে এটি ধরা পড়েছে। নিরাপত্তার ঘাটতি হয়নি বলে জানান তিনি। তার মতে, যাত্রী হিসেবে ইলিয়াস কাঞ্চনেরই উচিত্ ছিল আগেভাগে তা জানানো।
সূত্র জানায়, বিমান বন্দরের স্ক্যানিং মেশিনগুলো ঠিকভাবে কাজ করে কি না, কিংবা এগুলো সচল ছিল কি না— তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শুধু স্ক্যানিং মেশিন নয়, অন্যান্য কেনাকাটায়ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে বরাবরই যোগসাজশ রয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের—এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে শুধু নিরাপত্তা ইস্যুই নয়, মানসম্মত সেবাও মিলছে না বিমান বন্দরে। তদারকির বালাইও নেই। এখন নিজেদের দোষ আড়াল করতে বলা হচ্ছে— যাত্রীদেরই উচিত আগেভাগে অস্ত্রের কথা জানানো। সাধারণ যাত্রীদের প্রশ্ন— যদি দুস্কৃতকারীরা এভাবে অস্ত্রসহ ঢুকে পড়ত, তবে যেকোন ঘটনা ঘটানোই সম্ভব হতো। আর যদি দ্বিতীয় স্ক্যানারে ধরা পড়ে থাকে, তাহলে একজনকে বরখাস্ত করা হল কেন?
সংশ্লিষ্টরা জানান, বৈধ অস্ত্র থাকলে যাত্রীকে বিমানবন্দরে প্রবেশের আগেই ঘোষণা দিয়ে তা সিভিল এভিয়েশন কর্মীদের কাছে জমা দিতে হবে। অস্ত্রের লাইসেন্সও প্রদর্শন করতে হবে। অস্ত্রটি বৈধ নিশ্চিত হলে নির্ধারিত ফরম পূরণের পর সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স কর্মীরা গুলি, অস্ত্র আলাদা করে তা পাইলটের কাছে জমা রাখবেন। ফ্লাইট শেষে পাইলট নিরাপত্তা কর্মীর মাধ্যমে এটি যাত্রীর কাছে হস্তান্তর করবেন।
সূত্রমতে, কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা কিংবা যাত্রীসেবার চেয়ে বেশি ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। কর্মকর্তাদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও রয়েছে। দায়িত্বে গাফেলতির বিষয়টিতো আছেই। এর আগে বৃটিশ এভিয়েশনের জন লাভসের এক প্রতিবেদেনে ঢাকার বিমানবন্দর নিয়ে বলা হয়েছিল, এখানে যাত্রীদের সঠিকভাবে স্ক্যানিং করা হয় না এবং মালামাল ট্যাগ করার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় না। যারা দায়িত্বে থাকেন তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি তারা লোকের সঙ্গে গল্প করা, টেলিফোনে কথা বলায় মশগুল থাকেন। আন্তর্জাতিক নিয়মে একজন কর্মী ২০ মিনিট স্ক্যান করার পর তাকে ৪০ মিনিট বিশ্রাম দেয়ার কথা। বাংলাদেশে লোকবল কম থাকায় এক বা দুই ঘণ্টা একটানা কাজ করতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনার পর মঙ্গলবারের ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে, বিমান বন্দরে নিরাপত্তা দুর্বলতা মারাত্মক। এধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বহির্বিশ্বে ভাবমূর্ত্তি নষ্ট করতে যথেষ্ট। এর আগেও নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ থেকে কার্গো বিমান চলাচল সাময়িক বন্ধ রেখেছিল।