তের বছর বন্ধ মিলে খরচ ১২ কোটি টাকা

আগামী ৩০ নভেম্বর বন্ধের ১৩ বছর পূর্ণ করবে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল। মিলটি নতুনভাবে পুনরায় চালু করার জন্য সরকারিভাবে বার বার নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও তার কোনো অগ্রগতি নেই। বরং প্রতি মাসে বন্ধ মিলটি রক্ষণাবেক্ষণ ও বিদ্যুত্ বিলসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় হচ্ছে  প্রায় ১০ লাখ টাকা। বন্ধ মিলটির পেছনে গত ১৩ বছরে ব্যয় হয়েছে ১২ কোটি টাকা। অপরদিকে অবহেলা ও অযত্নে মিলটির কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। তবে মিলের কর্মকর্তারা বলছেন, মিলটি সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে চালুর বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তাছাড়া ৮০০ মেগাওয়াট সম্পন্ন কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টিও অনেক দূর এগিয়েছে। এ জন্য জমির মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া চলছে।

 
১৯৫৯ সালের ১৫ জুন নগরীর খালিশপুরে ভৈরব নদের তীরে প্রায় ৯০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল। তখন এ মিলের বার্ষিক উত্পাদন ক্ষমতা ছিল ৪৮ হাজার মেট্রিক টন। সুন্দরবনের গেওয়া কাঠ এবং সিলেটি ও বিদেশি মন্ড দিয়ে এই মিলে নিউজপ্রিন্ট কাগজ, রঙিন কাগজ, র্যাপার, বুকপ্রিন্ট ও সাদা কাগজ তৈরি করা হতো। প্রতিষ্ঠার পর থেকে লাভজনক এই মিলটি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সে সময় দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হতো এই মিলের নিউজপ্রিন্ট। কিন্তু স্বাধীনতার দুই দশক পর মিলটি লোকসানের কবলে পড়ে। মূলত ১৯৯৪-৯৫ সালে তত্কালীন সরকার উন্নতমানের নিউজপ্রিন্ট বিনা শুল্কে আমদানি করার সুযোগ দেয়ায় খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের তৈরি কম উজ্জ্বল ও ৫২ গ্রামের নিউজপ্রিন্টের বাজার চাহিদা মারাত্মক হ্রাস পায়। এছাড়া উত্পাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে সরকার কর্তৃক কাগজের মূল্য নির্ধারণ, চলতি মূলধনের সংকট, সুন্দরবন বন বিভাগ কর্তৃক প্রধান কাঁচামাল গেওয়া কাঠের সরবরাহ হ্রাস এবং ফার্নেস অয়েলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে মিলটির লোকসান বাড়তে থাকে। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০২ অর্থবছর পর্যন্ত সাত বছরে নিউজপ্রিন্ট মিলটি ২৮৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা লোকসান দেয়। অব্যাহত লোকসান ও চলতি মূলধনের অভাবে ২০০২ সালের ১০ জানুয়ারি মিলটি বন্ধ করে দেয়া হয়। উত্পাদন কর্মকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তা ও প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে যায়। দেশের সংবাদপত্র শিল্প ছিল এই নিউজপ্রিন্ট মিলের ওপর নির্ভরশীল। মিলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংবাদপত্র শিল্প পড়ে গভীর সংকটে। যে সংকট আজো কাটেনি।
 
এদিকে, বন্ধের পর থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিসিআইসি মিলটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৮ লাখ টাকা প্রদান করে। এরপর মিল এলাকায় স্থাপিত র্যাবের ক্যাম্প চলে যাওয়ায় নিরাপত্তাজনিত কারণে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আনসার সদস্য বাড়ানো হয়। এতে প্রতি মাসে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ৮ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নিরাপত্তা কর্মীদের বেতন ও বিদ্যুত্ বিল, গেস্ট হাউস, ইলেকট্রিক্যাল ও পানির পাম্প মেইনট্যানেন্স, অফিস খরচ, ফ্যাক্সসহ বিভিন্ন খাতে এ অর্থ ব্যয় করা হয়। এই হিসাবে গত ১৩ বছরে মিলটিতে বিসিআইসি থেকে ১২ কোটি ৩২ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে।
 
উপ-ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. নুরুল্লা বাহার জানান, মিলটির ৫০ একর জায়গাতে বিদ্যুত্ প্লান্ট নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে জমির পরিমাপ শেষ হয়েছে। বর্তমানে মূল্য নির্ধারণ ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে।
 
মিলের প্রকল্প প্রধান মো. মামুনুর রসুল জানান, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের স্থানে ৪৫ হাজার মেট্রিক টন উত্পাদন ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন একটি কাগজ কল তৈরি করা হবে। কাগজ কলটিতে সাদা প্রিন্টসহ ৫ ধরনের কাগজ তৈরি করা যাবে। সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে মিলটি চালু করা হবে। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। নর্থওয়েস্টার্ন পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির সিনিয়র প্রকৌশলী শহিদুল মোরছালিন জোয়ার্দার জানান, নিউজপ্রিন্ট মিলের অভ্যন্তরে চারশ’ মেগাওয়াট করে দু’টি মোট ৮০০ মেগাওয়াট সম্পন্ন কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এর জন্য প্রায় ৬০ একর জমির প্রয়োজন। ইতিমধ্যে জমির পরিমাপ করা হয়েছে। তবে, জমির মূল্য নির্ধারণ ও হস্তান্তর করা হয়নি। তিনি বলেন, নতুন বিদ্যুত্ কেন্দ্রটিতে জ্বালানি হিসাবে ভারত থেকে আমদানি করা এলএনজি গ্যাস (তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) ব্যবহার করা হবে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা।
 
খুলনা উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারপার্সন শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন বলেন, এশিয়ার সর্ববৃহত্ খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলটি চালু করা হলে দেশে শিক্ষার প্রসার ও সংবাদপত্র শিল্পে মিলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। দেশের ঐতিহ্যবাহী এই মিলটি অবিলম্বে চালু করার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দাবি জানান।