আজ ৮ মার্চ। আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হইল—ব্যালান্স ফর বেটার তথা ভালোর জন্য ভারসাম্য। এই ভারসাম্য বা সমতা বিধানে পুরুষের সহায়তা ও সমর্থন আজ সবচাইতে জরুরি। বর্তমান বিশ্বে সমাজ-রাষ্ট্রের শীর্ষপদ হইতে সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ সর্বত্র নারীর সদর্প অবস্থানের দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। তাহারপরও নারী আজ অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার, অধিকার বঞ্চিত ও নির্যাতিত-নিপীড়িত। অথচ পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা নারীকে বঞ্চিত রাখিয়া মানবতার উন্নয়নের দাবি নিষ্ফল হইতে বাধ্য। নারী দিবস আমাদের মনে করিয়া দেয় দেড়শত বত্সর আগে অধিকার আদায়ে সোচ্চার হাজার হাজার নারীশ্রমিকের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কের সেলাই কারখানায় বিপজ্জনক ও অমানবিক কর্মপরিবেশ, স্বল্প মজুরি ও দৈনিক ১২ ঘণ্টা শ্রমের বিরুদ্ধে নারী শ্রমিকরা প্রতিবাদ করেন। ইহার পর বিভিন্ন ঘটনার ধারাবাহিকতায় ১৯১০ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত শ্রমজীবী নারীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ৮ই মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করা হয়। আর জাতিসংঘ ১৯৭৫ সাল হইতে এই দিনটিকে নারী দিবস হিসাবে পালন শুরু করে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সামপ্রতিককালে বাংলাদেশে নারীর তাত্পর্যপূর্ণ উন্নয়ন হইয়াছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি ৪১ লক্ষ কর্মজীবী মানুষের মধ্যে ১ কোটি ৬২ লক্ষ নারী। প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ নারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তা। আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ৮০ শতাংশের বেশি নারী। ফুটবল ও ক্রিকেটেও নারীর জাগরণ দৃশ্যমান। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়ন একটি বড় অগ্রগতি। জেন্ডার সমতা নির্ধারণে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্তও ইতিবাচক। গত এক দশকের নিরন্তর প্রচেষ্টায় বর্তমানে দেশে নারী শিক্ষার হার যেমন বাড়িয়াছে, তেমনই নারী উন্নয়নের সার্বিক সূচকে বিশ্বে বাংলাদেশ ৬৪তম অবস্থানে থাকিলেও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসগারীয় অঞ্চলভুক্ত ২৪টি দেশের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার পরেই দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রহিয়াছে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীর অংশগ্রহণের মান হিসাবে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন ২০১০, ডিএনএ আইন ২০১৪, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৩-২০২৫ প্রণয়ন, পোশাকশিল্পে প্রথমবারের মতো ওয়েজবোর্ড গঠন ইত্যাদি উদ্যোগ ফলপ্রসূ হইয়াছে। তাহার পরও মজুরি নির্ধারণে বৈষম্য, যৌতুক, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক সহিংসতা, কর্মস্থল ও গণপরিবহনে যৌন হয়রানি, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি সমস্যা রহিয়াছে। ইহার জন্য নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নারী-পুরুষের সম্মিলিত অঙ্গীকারই গড়িয়া তুলিতে পারে সমতার বিশ্ব, ভারসাম্যের বিশ্ব।
নারীর অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করিতে হইলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পাশাপাশি তাহার গুণগত উন্নয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অগ্রগতি, নারীর অনানুষ্ঠানিক কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ সংবেদনশীল পরিবেশ, নারীবান্ধব আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও বৈষম্য দূরীকরণ, জনসংখ্যা অনুপাতে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, অভিভাবকত্ব আইনে নারীর অভিভাবক হইবার সুযোগ দান ইত্যাদির প্রতি এখন নজর দেওয়া আবশ্যক। কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখিয়াছেন, ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’। সমাজ-সভ্যতার অগ্রযাত্রায় নারীর ভূমিকা আসলে সমান্তরাল। আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তাহাদের এই অবদানকে আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি। জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।