মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর কোরিয়ার বৈরিতা একটি দীর্ঘকালীন ঘটনা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পরবর্তীকালে যে কোরিয়া যুদ্ধের সূচনা তার ফলে বিভক্ত হয় উপদ্বীপটি। মার্কিন বলয়ে দক্ষিণ কোরিয়া এবং রুশ প্রভাবাধীনে উত্তর কোরিয়া এতদিন যুদ্ধ যুদ্ধ পরিবেশেই সময় অতিবাহিত করেছে। কোনো মার্কিন সরকারই এই অবস্থার ব্যতিক্রম ঘটায়নি। ট্রাম্প যখন ক্ষমতাসীন হন তখন বৈরিতা আরও বৃদ্ধি পায়। কূটনীতিকরা রসিকতা করে দুই নেতার ‘মাথা গরম’ বৈশিষ্ট্যের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেন। ট্রাম্প নেতৃত্বের প্রথম দিকে বৈরিতার বাক্যবাণ এতই বৃদ্ধি পায় যে, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সে সময়ে অনেকটা আকস্মিকভাবেই ট্রাম্প-উন গরম থেকে নরমে আসেন। এবার তারা একে অপরের প্রশংসার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। এর ফলে ২০১৮ সালের জুন মাসে সিঙ্গাপুরে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটি সফল না ব্যর্থ এই বিতর্কে না গিয়ে বিশ্লেষকরা এই বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন যে, তাদের মুখোমুখি বসাটিই একটি সাফল্য। বৈঠকের পরও দুই দেশের মধ্যে নরম গরম কথাবার্তা হয়েছে। তার মাঝেও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। ফলশ্রুতিতে সংঘটিত হয় দ্বিতীয় শীর্ষ বৈঠক। ২৭-২৮ ফেব্রুয়ারি ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে এই আলোচিত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকের শুরুতে উভয় পক্ষে উষ্ণতার আতিশয্য পরিলক্ষিত হয়। হ্যানয়ে পৌঁছার পর দুই নেতা আনুষ্ঠানিক ভোজ সভায় বৈঠকের সফলতা সম্পর্কে উচ্চ ধারণা ব্যক্ত করেন। হোয়াইট হাউস কর্তৃপক্ষ একটি যৌথ চুক্তিতে পৌঁছার ব্যাপারে যথেষ্ট আশাবাদী ছিলেন। ভিয়েতনামের একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ লিম সোহো বলেন যে, ‘ভোজ সভায় তাদের যে হাসিমুখ দেখেছি তাতে চুক্তিতে না পৌঁছানোটাই বিস্ময়কর মনে হচ্ছে।’ তিনি অবশ্য আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আজ চুক্তি না হলেও আগামীকাল যে চুক্তি হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আলোচিত বিষয়াবলি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো দীর্ঘ বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। সুতরাং আশা-আশঙ্কার মধ্য দিয়েই একটি সমাধানে পৌঁছতে হবে। প্রথম বৈঠকের তাত্পর্য ব্যাখ্যা করে এই বিশ্লেষক বলেন যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে এই প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা মুখোমুখি বসলেন। সেখানে সাধারণভাবে কোরিয়া উপদ্বীপকে পারমাণবিক প্রতিযোগিতামুক্ত করার যে সদিচ্ছা ব্যক্ত করা হয়েছে তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈঠক সম্পর্কে দক্ষিণ কোরিয়ার তরফ থেকে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করা হয় এবং ইতিবাচক মন্তব্য করে বলা হয় যে, উভয়পক্ষ আলোচনায় বেশ অগ্রগতি সাধন করেছে। ঊর্ধ্বতন চীনা কূটনীতিক ওয়াং ই বলেন যে, আলোচনাটি সত্যি কঠিন ছিল, তবে চীন তার গঠনমূলক ভূমিকা অব্যাহত রাখবে। জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিন জো অ্যাবে মার্কিন সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষণ করার সাথে সাথে উত্তর কোরিয়ার নেতার সাথে শিগগির সাক্ষাত্ করার আশা প্রকাশ করেন। অবশেষে আলোচনা ভেঙে গেলেও হোয়াইট হাউস কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেন যে, সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকবর্গ ভবিষ্যত্ বৈঠকের ব্যাপারে আশাবাদী। ভিয়েতনাম ত্যাগের পূর্ব মুহূর্তে প্রদত্ত বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের আগে উত্তর কোরিয়ার নেতা সকল আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহারের যে দাবি জানিয়েছেন তা অগ্রহণযোগ্য। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, দুইদিনের আলোচনায় বেশ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিশেষ করে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ে আলোচনা ইতিবাচক। তবে হুট করে কোনো খারাপ চুক্তিতে উপনীত হওয়ার চেয়ে কোনো চুক্তি না হওয়া ভালো। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অবরোধের বিষয়টিই ছিল উত্তর কোরিয়ার মূল দাবি। আমরা তা মেনে নিতে পারিনি। উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়া ব্যাপকভাবে পারমাণবিক এবং আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। এতে ঐ অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের বেশ অবনতি ঘটে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার ঐ বিবৃতিতে বলেন, কোনো কোনো সময়ে এ ধরনের অবস্থায় আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। তবে এই বেরিয়ে আসাটি বন্ধুত্বপূর্ণ। আলোচনা থেকে ট্রাম্পের এই বেরিয়ে আসাকে বিশ্লেষকগণ তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলে বর্ণনা করছেন। ট্রাম্পের কূটনৈতিক কার্যক্রমকে অনেকে প্রচলিত রীতি রেওয়াজ অনুসৃত মনে করেন না।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞগণ হ্যানয় বৈঠকের ব্যর্থতাকে হোয়াইট হাউসের প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলে মনে করেন। যেহেতু প্রথম বৈঠক থেকে দ্বিতীয় বৈঠকের সময়কালে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা স্থগিত রেখেছে এবং অবরোধ প্রত্যাহূত হলে এ ধরনের সকল স্থাপনা ভেঙে দিতে রাজি হয়েছে, সুতরাং ব্যর্থতার দায়ভার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপরই বর্তায়। ট্রাম্প হ্যানয় ত্যাগের সময়ও উত্তর কোরিয়ার ঐ সদিচ্ছার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং বলেন কিম তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, সামনের দিনগুলোতেও ঐ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ থাকবে। হ্যানয় আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ অবরোধ এবং পারমাণবিক নিরোধ— এই দুটির কোনটি আগে করা হবে তা নিয়ে দু’নেতার বিরোধ। নীতিগতভাবে উভয় নেতা বিষয়টি স্বীকার করলেও কেউই তাদের ব্যক্তিগত জেদ ত্যাগ করতে চাননি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও আলোচনা বৈঠককে ব্যর্থ বলে স্বীকার করতে চাননি। তিনি ভবিষ্যত্ চুক্তির ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বৈঠকের ব্যর্থতা সম্পর্কে কূটনৈতিক বিশ্ব প্রস্তুত ছিল না। বরং মার্কিন বিশেষজ্ঞগণ অস্থিতিশীল ট্রাম্প সম্পর্কে আশঙ্কা করছিলেন যে, তিনি তার কূটনৈতিক সফলতা দেখানোর জন্য উত্তর কোরিয়াকে বড় ধরনের ছাড় দিয়ে বসতে পারেন। উল্লেখ্য যে, ট্রাম্প বার বার বলছিলেন যে, চুক্তি মেনে নিলে উত্তর কোরিয়া একটি সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যানয়ের উদাহরণ দিয়ে উত্তর কোরীয় নেতা কিমকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখান। হ্যানয় অবশ্য বৈঠকের ব্যাপারে নিরুত্তাপ রয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভিয়েতনামের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্কারে মিলিত হন। তিনি ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নোগুয়েন ফু থ্রং এর সাথেও সাক্ষাত্ করেন। স্মরণ করা যেতে পারে যে, কোরিয়া উপদ্বীপের বিভক্তির মতো এক সময়ে ভিয়েতনামও মার্কিন হস্তক্ষেপে বিভক্ত হয়ে পড়ে। রক্তাক্ত ও ক্লান্তিকর যুদ্ধশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭০ সালে সফল কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জারের দৌড়ঝাঁপ কূটনীতির ফলশ্রুতিতে অবশেষে প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে তারা সসম্মানে ভিয়েতনাম ত্যাগ করে।
সেই ভিয়েতনাম এখন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানোর পরিবেশ অর্জন করেছে। এই বৈঠকের বিষয়ে ভিয়েতনাম শুধুমাত্র আতিথেয়তার কাজ করেছে, আর কিছু নয়। চীনা কূটনীতিকরা এ রকমই মনে করেন। তবে ভিয়েতনাম সরকারিভাবে এর চেয়ে বেশি কিছু করতেও চায় না। ভিয়েতনাম এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও একই সাথে উত্তর কোরিয়ার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। জাতিসংঘ আরোপিত অবরোধের কারণে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে কোনো বাধা নেই। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এক সময় উত্তর কোরিয়ার সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করবে বলে মনে করেন একজন চীনা সমাজবিজ্ঞানী লু চাও। তিনি এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা বলেন। ট্রাম্পের এক টুইটে এ কথার সমর্থন মেলে। তিনি লিখেছেন, আমি বিশ্বাস করি উত্তর কোরিয়া একদিন অর্থনৈতিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এক্ষেত্রে চীন, রাশিয়া, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার যথার্থ সহায়তা পাওয়া যাবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ঐ অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা তথা পারমাণবিক ভীতি দূর হলে ব্যাপক সমৃদ্ধি ঘটবে। উত্তর কোরিয়ার অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ভীতির অবসান ঘটবে। দক্ষিণ কোরিয়ার হ্যানদং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক একটি কৌশলগত অবস্থানের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, জাপান এবং জাপানের বর্তমান নেতৃত্ব প্রত্যাশিত যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়া চুক্তি কৌশলগত কারণেই চায় না। যদি উত্তর কোরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া ভীতির অজুহাত দেখিয়ে মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হবে। উত্তর কোরিয়ায় বর্তমান নেতৃত্ব বহাল রেখে শান্তি স্থাপনের পরিকল্পনা সকল পক্ষের জন্যই কঠিন হবে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেনিজুয়েলার মতো ‘রেজিম চেঞ্জ’ এর নীতি গ্রহণ করে, তার বাস্তবায়ন উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে এক রকম অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ঘটনাবলির আদিঅন্ত পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের সংকটই কোরীয় উপদ্বীপ তথা উত্তর কোরিয়া বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তির অন্তরায়। উদ্দিষ্ট যৌথ চুক্তির পূর্বশর্ত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর শক্তি ও ভীতি প্রয়োগের নেতিবাচক সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকা। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, উত্তর কোরিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি কার্যকর চুক্তির প্রান্তসীমায় উপনীত হয়েছিল। ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা অনিচ্ছা অবশেষে চুক্তিটিকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেছে। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পামারস্টোন বলেছিলেন, ব্রিটেনের স্থায়ী শত্রু এবং স্থায়ী মিত্র নেই, আছে স্থায়ী স্বার্থ। পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হলো, জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ। উত্তর কোরিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উভয় নেতা যদি ঐ বাস্তব সত্য অনুধাবন করেন এবং ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কোরীয় সঙ্কট সমাধানে একত্রিত হন, তাহলে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ায় শান্তি স্থাপনে তারা সক্ষম হবেন।
n লেখক: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়