দক্ষ হাতের ইলেক্ট্রিশিয়ান

খুব আগ্রহ নিয়ে মেশিনটি পরীক্ষা করছেন নাসিমা। তিনি কাজ করেন সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত সিঙ্গার কোম্পানির কারখানায় ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোলার’ হিসেবে। কোম্পানির উত্পাদিত বিভিন্ন বৈদ্যুতিক পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তারই। দক্ষ হাতে সামলাচ্ছেন এই দায়িত্ব।

নাসিমা আক্তার জানান, ছয়মাসের ট্রেনিং নিয়ে তিনি এই কাজে যোগ দেন। এর আগে তিনি দুই বছর দেশের বাইরে থেকেছেন। এখন দেশেই স্বামী-সংসার নিয়ে ভাল আছেন। শুধু নাসিমা নন, তার সঙ্গে এখানে আরো ৬ জন পণ্যের গুণগতমান পর্যবেক্ষণ করে পণ্য ঠিক আছে কিনা তা নির্ধারণ করেন। তারপর তা বিক্রির জন্য প্যাকেট করা হয়।

জয়নব খাতুন সোহাগি এই কারখানাতেই ইলেক্ট্রিশিয়ান হিসেবে উত্পাদন বিভাগে কাজ করেন। সোহাগির এখনও বিয়ে হয়নি। দুই বোন ঢাকার একটি কলেজে ডিগ্রী পড়ছে, বাবা এনজিওতে চাকরি করেন, মা বাড়িতেই থাকেন। বোনদের পড়াশনা আর সংসার চালাতে সোহাগীর আয় কাজে লাগে। স্বপ্ন দেখেন বোনদের শিক্ষিত করবেন আর সংসারে স্বচ্ছলতা আনবেন।

এই কোম্পানির উত্পাদন ব্যবস্থাপক সাব্বির মাহমুদ রিজওয়ান জানান, তাদের এখানে ম্যানেজার লেভেলে একজন, স্টোর অ্যাসিসটেন্ট একজন, দুইজন সিনিয়র সুপারভাইজারসহ অনেক নারী কাজ করেন। সঠিক সংখ্যা জানতে চাইলে জানান তাদের  প্রোডাকশনে ৯৬ জন কর্মীর মধ্যে ৫৭ জন নারী আর টিভি প্যানেলে ৩০ জন কর্মীর মধ্যে ২৩ জন নারী কাজ করছেন। নারীরা কাজে মনোযোগী, ভাল কাজ করে আর সিঙ্গার সুবিধাবঞ্চিত নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আগ্রহী।

কথা হয় স্টোর ম্যানেজার রিজিয়া পারভীনের সঙ্গে। তার একটি মেয়ে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে পড়ছে। ২০১৭ সালে স্টোর ম্যানেজারের দায়িত্ব পান তিনি। এর আগে স্টোর অফিসার, প্রোডাকশন সুপারভাইজারের দায়িত্বও পালন করেছেন। ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক্যাল ইনষ্টিটিউট থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিকসে ডিপ্লোমা করে ১৯৯৩ সালে প্রথমে ‘নিপ্পনে’-এ যোগ দেন রিজিয়া। এখন ৫০ হাজারেরও বেশি মাসিক বেতনে একজন নারী ও তিনজন পুরুষ সহকর্মী নিয়ে সিঙ্গারের কারখানার স্টোরের দায়িত্ব পালন করছেন।

জেবুন্নেসা ২৫ বছর কাজ করে আজ সুপারভাইজারের দায়িত্ব পালন করছেন। মিরপুরে থাকেন, অফিসের গাড়িতে যাতায়াত করেন। অফিসে কাজের পরিবেশ ভাল, তাদের কাজ করতে কোন সমস্যা হয় না। সিঙ্গারের কারখানায় কর্মরত নারীদের প্রশ্ন করি, এখানে তাদের ছোট শিশুদের জন্য দিবা-যত্নকেন্দ্র আর প্রসূতি মায়ের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি আছে কিনা। উত্তরে জানালেন, বেতনসহ তারা ৪ মাসের মাতৃত্বকালিন ছুটি পান। একটি শিশু কেন্দ্রও আছে, কিন্তু কেউ শিশুকে নিয়ে আসেন না।

সিঙ্গারের মার্কেটিং ডিরেক্টর চন্দনা সামারা সিংহে বলেন,ঐতিহাসিকভাবে সিঙ্গার সেলাই মেশিনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করছে। নারীর দারিদ্র্যতা দূর করতে ব্র্যাকের সাথে দক্ষ টেইলর প্রশিক্ষণ দিতে ‘অবলম্বন’ কর্মসূচি চালু করেছে। সিঙ্গার নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাসী।

আর্ন্তজাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবছর তাদের একশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘ব্রেকিং জেন্ডার বেরিয়ার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড অব ওয়ার্ক’ শীর্ষক একটি বই বের করছে। সেখানে বাংলাদেশে নারীর প্রথাগত পেশার বাইরে গিয়ে কাজ করার উপর আলোচনা করা হয়। আইএলও এ যাবত ইলেক্ট্রিক্যাল সেটিং, এয়ারকন্ডিশন ও রেফ্রিজারেশন, কাঠমিস্ত্রি, মোটরসাইকেল রিপেয়ারিং, হাউজকিপিং-এমন ১৪টি বিষয়ে নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কিছু সেক্টরে নারীরা কাজ করছে এবং ভাল করছে। 

আইএলও বলছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, কিন্তু শ্রম বাজারে নারীর অংশগ্রহণ হ্রাস পাচ্ছে এবং তাদের প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও দক্ষ চাকরির সুযোগ এখনও একটি চ্যালেঞ্জ। যদিও বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ উদীয়মান অর্থনীতিগুলির মধ্যে একটি। ২০১৪ সালের ‘দ্য ন্যাশনাল জেন্ডার ইকুইটি ইন টিভিইট’-এর লক্ষ্য ছিল কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে নারীর অংশগ্রহণ কমপক্ষে ৪০ শতাংশে বৃদ্ধি করা। তবে ২০১৬ সালের এক হিসাব মতে প্রযুক্তিগত, কারিগরি ও প্রশিক্ষণে নারীর অংশগ্রহণ ২৪ শতাংশ।

আইএলও বাংলাদেশের প্রধান কারিগরি উপদেষ্টা কিশোর কুমার সিংহ ইত্তেফাককে বলেন, দেশে প্রশিক্ষিত নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৮ শতাংশ। ১৫ শতাংশ নারী শ্রমিক হিসাবে কাজ করছে। কারিগরি ও ভকেশনাল শিক্ষায় ২৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ নারীর প্রবেশগম্যতা রয়েছে। এই সুযোগ বাড়াতে মানসিকতার পরিবর্তন, নীতিমালা বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং বাজেট প্রণয়নে জোর দেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার মনে করেন, সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে একযোগে কাজ করে দক্ষ নারীর কাজের জায়গা প্রসারিত করতে হবে। উপযোগী আইন ও নীতিমালার প্রণয়ন, সিডও সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের রায় কার্যকর করতে হবে। তেমনি আইএলও বিধি অনুসারে নারী শ্রমিকের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার, বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং যাতায়াত সুবিধা প্রদানের পাশপাশি সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ আজও আমাদের সমাজ কারিগরি শিক্ষাকে নেতিবাচক ভাবে দেখা হয়।