সীতাকুণ্ডে গ্যাস সংকটে পাটকল বন্ধের উপক্রম

গ্যাস সংকটে এক সময়ের ১২শ শ্রমিকের পাটকল এম এম জুট মিলে আজ উত্পাদন প্রায় বন্ধ। হাতে গোনা কিছু শ্রমিক রয়েছেন, তারা সাত সপ্তাহ ধরে বেতন পাচ্ছেন না। সীতাকুণ্ডের আরেকটি পাটকল আর আর জুট মিল আংশিক উত্পাদনে থাকলেও গ্যাস সংকটে বয়লার সচল করা যাচ্ছে না। ফলে পূর্ণাঙ্গ উত্পাদনও সম্ভব হচ্ছে না। ৬০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত পাটকলগুলো দেশ স্বাধীনের পর থেকে বেহাল হতে থাকে। বর্তমানে সীতাকুণ্ডের সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ অঞ্চলের এক সময়ের ব্যস্ত টেক্সটাইল মিল-গুলো এখন শুধুই স্মৃতি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে গোডাউন হিসেবে ভাড়া দিয়ে কিছু আয়ের চেষ্টা চলছে। যে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে তার মধ্যে ন্যাশনাল কটন মিলস, পাইলন কটন মিলস উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে পাটকলগুলোর মধ্যে চালু রয়েছে আর আর জুট মিলস, এম.এম জুট মিলস, গুল আহমদ জুট মিলস ও হাফিজ জুট মিলস। আর আর জুট মিলে যেখানে ১২০০ শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল সেখানে বর্তমানে মাত্র ১৭৬ শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারি আছে।

 
বিজেএমসি সূত্রে জানা যায়, দেশের পাটকলগুলোতে ভর্তুকির পরিমাণ ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ছিল প্রায় ৬২ কোটি টাকা যা ১৪-১৫ অর্থ বছরে হয়েছে প্রায় ৮৪ কোটি টাকা। বিজেএমসির লোকসানের পরিমাণ ছিল ৬৩৯ কোটি টাকা। ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতাসহ পণ্য উত্পাদন খরচ বেশি হওয়ায় দেশের পাটকলগুলো বছরের পর বছর লোকসান গুণছে। পাকিস্তানি আমলে গড়ে ওঠা পাটকলগুলো দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতোই রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। পাটকলগুলো বিজিএমসির এবং টেক্সটাইল মিলগুলো বিটিএমসির আওতায় নেয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে ব্যক্তি মালিকানার কিছু মিল ব্যক্তি খাতে হস্তান্তর করা হয়।
 
পরবর্তীতে অব্যবস্থাপনা আর আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে আস্তে আস্তে টেক্সটাইল মিলগুলো বন্ধ হয়ে যায়। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা, আর উত্পাদন খরচ বেশি হওয়ায় জুট মিলগুলোও বন্ধ হওয়ার পথে। যে কয়টি চালু আছে তারা ব্যয় কমাতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় কর্মী সংখ্যা কমিয়েছে।
 
সংশ্লিষ্টরা জানান, একসময়ের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান পণ্য সোনালী আঁশ পাটের ব্যবহার কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের পাট পণ্যের উত্পাদন কমে গেছে। পাট মন্ত্রণালয়ের এক তথ্যানুযায়ী গত পাঁচ বছরে আগের পাঁচ বছরের তুলনায় ২৬৩৭ লাখ বেল কম পাট রপ্তানি হয়েছে। মিল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাটজাত পণ্যের ব্যবহার কমে যাওয়ায় মিলগুলোর উত্পাদনও কমে গেছে। এদিকে পাট সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী যেখানে পরিবেশ বান্ধব বিবেচনায় পাট ও প্রাকৃতিক ফাইবারের ব্যবহার বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশে এর ব্যবহার কমছে। সরকার পাটের ব্যবহার বাড়াতে আইন করলেও তার বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশে পাটের ব্যবহার বাড়ছে না।
 

সীতাকুণ্ডের আর.আর জুট মিল এবং এম.এম জুট মিল ঘুরে দেখা গেছে শ্রমিক সংখ্যা কমে যাওয়ায় উত্পাদন ক্ষমতাও কমেছে। অনেক তাঁত বন্ধ থাকায় সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ছে। সীতাকুণ্ডের পাটকল কর্মকর্তারা জানান, যে পাটকলগুলো চালু রয়েছে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় তারা ভরা মওসুমে পাট কিনতে পারছে না। মওসুম শেষ হলে তাদের বেশি দামে পাট কিনতে হচ্ছে। আর আর জুট মিলে গিয়ে দেখা গেছে, এই মিলে ৭০টি তাঁতের মধ্যে মাত্র চারটি চালু রয়েছে। ফলে তাঁত শ্রমিকদেরকে বেকার বসে থাকতে হচ্ছে। বেতন-ভাতা ও অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতি মাসে ৪৫ লাখ টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে। মিল ব্যবস্থাপক জানান, এ পাটকলের উত্পাদিত পণ্যের বেশির ভাগ রপ্তানি করা হয়। বর্তমানে বয়লার ছাড়া কিছু উত্পাদন চালু রাখায় এবার ৫ লাখ টাকা লোকসান কম হয়েছে। এদিকে মিলের শ্রমিক নেতা নূরুল হক জানান, সরকার যদি আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে পাট চাষিদের কাছ থেকে পাট কিনে গুদামজাত করে রাখে তাহলে লোকসানের পরিমাণ কমে যাবে। এ সময়ে পাট কিনতে পারলে ফড়িয়াদের হাতে পাট যাবে না এবং পরে উচ্চ মূল্যে ফড়িয়াদের কাছ থেকে মিলের জন্য পাটও কিনতে হবে না। তিনি আরো জানান, সরকার যদি পাট কেনার জন্য থোক বরাদ্দ দেয় এবং গ্যাস লাইন চালু করা যায় তাহলে মিলের উত্পাদন দিয়েই শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস দিয়েও কিছু লাভের মুখ দেখা সম্ভব। অন্যদিকে এম.এম জুট মিলের অবস্থাও শোচনীয়। কারখানা সংশ্লিষ্টরা জানান, এই মিলে প্রায় ১২/১৩শ শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল; কিন্তু বর্তমানে ১৩০/১৪০ শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে। ঈদের আগে শ্রমিকদের ৮ সপ্তাহের মজুরি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুই মাসের বেতন বাকি ছিল। এই মিলের সিবিএ সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম জানান, শুধু গ্যাস সংযোগ ঠিক করা হলে মিলটি পূর্ণ উত্পাদনে যেতে পারবে। হাজারো শ্রমিক আবার কাজ করার সুযোগ পাবে।