শিশু রাফসান জানে না তার মা আর বেঁচে নেই!

‘আম্মু ফোন দিয়েছে, আম্মু ফোন দিয়েছে’ বলে নানীর কোল থেকে ছোট্ট শিশু নাফিস রাফসান সিদ্দিকী মায়ের কক্ষের দিকে দৌড়ে যায়। কিন্তু গিয়েই অতি পরিচিত কক্ষটি সে তালাবদ্ধ দেখতে পায়। আম্মুর সাড়াশব্দ না পেয়ে রাফসান কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার কান্না দেখে নানী হালিমা বেগমও (৫৫) গুমরে কেঁদে ওঠেন। কিন্তু রাফসানকে কিছুই বলতে পারেন না। মেয়ের শোকে শুধুই নীরবে শাড়ির আঁঁচল দিয়ে চোখের জল মুছেন। একসময় অস্ফুট কণ্ঠে বলেন, ‘আমার নানু ভাই জানে না যে তার মা আর এই পৃথিবীতে বেঁচে নেই!’

 
গত বুধবার রাতে নগরীর মুন্সিপাড়া পুলিশ লাইন পূর্ব গলির ১৩ নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলায় নিজ কক্ষে চাচাতো দেবর হেদায়েত হোসেন মোল্লার (৩৪) শটগানের গুলিতে নিহত হন খুলনা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা মোল্লা জালাল উদ্দিনের পুত্রবধূ সোনিয়া রাব্বি সুলতানা লিপি (৩৫)। জালাল উদ্দিনের পরিবারের পক্ষ থেকে ‘রসিকতার ছলে’ এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে দাবি করা হলেও এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না নিহতের ভাইয়েরা।
 
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার লিপির শ্বশুর মোল্লা জালাল উদ্দিন তার ভাতিজা হেদায়েত হোসেন মোল্লাকে আসামি করে সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। এছাড়া ঘটনাটি তদন্তে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনা জেলার পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের জেলা সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম।
 
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত সোয়া ৮টার দিকে হঠাত্ করে মোল্লা জালাল উদ্দিনের বাসভবনে গুলির শব্দ শোনা যায়। এ সময় জালাল মোল্লার ভাতিজা হেদায়েত হোসেনকে দৌড়ে বাসা থেকে বের হতে দেখা গেছে। বাসার পঞ্চম তলা থেকে কান্নার শব্দ পেয়ে উপরে উঠে দেখা যায় নিজ শয়ন কক্ষের বিছানার ওপর জালাল মোল্লার বড় ছেলে কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী হেলালের স্ত্রী সোনিয়া রাব্বি সুলতানা লিপির নিথর দেহ পড়ে আছে। খাটের নিচে পড়ে আছে একটি শটগান ও শটগানের কভার। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়ে দেয়।
 
পারিবারিকসূত্রে জানা গেছে, পবিত্র হজব্রত পালন করতে মাকে নিয়ে সৌদি আরবে অবস্থানরত লিপির স্বামী কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী হেলালের আজ শুক্রবার দেশে ফেরার কথা রয়েছে। তিনি আসার পরই জানাজা এবং লাশ দাফন করা হবে। সে পর্যন্ত লাশ খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। নিহত লিপি বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার বেতাগা ইউনিয়নের মাশকাটা গ্রামের মৃত সাঈদুর রহমানের মেয়ে। ১৯৯৯ সালে হেলালের সাথে তার বিয়ে হয়।
 
এদিকে পুত্রবধূর অস্বাভাবিক মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন সাবেক এমপি মোল্লা জালাল উদ্দিন। তাকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ আত্মীয়-স্বজনরা এসে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। অনেকের সঙ্গেই তিনি কথা বলছেন। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের কাছে কোন মন্তব্য করতে চাচ্ছেন না।
 
জানা গেছে, কথিত হত্যাকারী হেদায়েত হোসেন মোল্লা সাবেক এমপি মোল্লা জালাল উদ্দিনের ভাই লুকাই মোল্লার ছেলে। এ সুবাদে চাচা জালাল মোল্লার বাসভবনে ছিল তার অবাধ যাতায়াত। হেদায়েত চাচার ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনাসহ বাজারহাটও করতেন। এমনকি তার গানম্যান হিসাবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরি করলেও চাচার ক্ষমতার দাপটে তিনি অফিসে যেতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
 

হত্যা রহস্য উন্মোচনের দাবি লিপির ভাই ও স্বজনদের : নিহত গৃহবধূ লিপির ভাই আসাদুজ্জামান মিলন বোনের হত্যাকাণ্ডকে কোনো ভাবেই ‘অসাবধানতা বা রসিকতার ছলে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে’ বলে মেনে নিতে পারছেন না। তিনি বলেন, যদি রসিকতার ছলেই শটগানের গুলি বের হবে, তাহলে সেটি তার মুখে বিদ্ধ হলো কিভাবে। শরীরের অন্যখানেও তো হতে পারত। পুরো ঘটনাটিকেই তিনি সন্দেহের চোখে দেখছেন।