এমপি লিটনের ক্যাডারদের সশস্ত্র মহড়া

শিশু সৌরভকে গুলি করা ও হাফিজার রহমানের ঘরবাড়ি লুটপাটের ঘটনার মামলার আসামি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সরকার দলীয় এমপি লিটনকে আট দিনেও পুলিশ খুঁজে পায়নি। প্রশাসন বলছে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, আন্দোলন করার কোন প্রয়োজন নাই। কিন্তু তার পেটোয়াবাহিনী এলাকায় আন্দোলন ও মিডিয়াতে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করতে মাঠে নেমেছে। এলাকার পরিস্থিতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন এমপি লিটন।

 
এমপি নতুন মোবাইল নম্বর থেকে তার পেটোয়াবাহিনীকে নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে সূত্র জানিয়েছেন। সে মোতাবেক পেটোয়াবাহিনী এলাকায় অস্ত্রসহ প্রকাশ্যে মোটরসাইকেল মহড়া ও আন্দোলনকারীদের হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু প্রশাসন এসব ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। মামলা দু’টি নথিভুক্ত করার পর স্থানীয় প্রশাসন গা ছাড়া ভাব ও উল্টো এমপির পেটোয়াবাহিনীকে গোপনে সহায়তা করায় উপজেলার রাজনৈতিক ও সুধি মহলসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে উত্তেজনা ও ক্ষোভ বৃদ্ধি পেয়েছে।
 
আন্দোলনকারী সংগঠন সুন্দরগঞ্জ নাগরিক সংগ্রাম পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাসুদ উল ইসলাম চঞ্চল বলেন, ‘এমপি লিটনের পেটোয়াবাহিনীর অস্ত্রসহ ঘোরাফেরা এবং হুমকি দেয়া বন্ধ করতে হবে। আমরা এমপি লিটনের দ্রুত বিচার দেখতে চাই। কিন্তু স্থানীয়  প্রশাসনের এসব ব্যাপারে কোন তত্পরতা দেখা যাচ্ছে না’।
 
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, মামলা দুটি প্রত্যাহরের জন্য আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের এমপির অনুগত ক্যাডাররা বাদীর পরিবারকে বিভিন্ন কৌশলে হুমকি দিয়েই যাচ্ছে। এমনকি মোটা অংকের টাকার প্রলোভনও তারা দেখাচ্ছে। তারা বৃহস্পতিবার বাড়িঘর লুটপাট মামলার বাদী হাফিজার রহমান মণ্ডলকে হুমকি দিয়ে ধরে গাইবান্ধা আদালতে নিয়ে যায়। আদালত প্রাঙ্গণে তাকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেয়। কিন্তু মামলা প্রত্যাহার কিংবা কোনো ধরনের আপস রফায় যেতে হাফিজার রাজি হননি। সূত্র আরো জানায়, উপজেলা ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র বহনের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি উপজেলা সদরের একটি চা দোকানের সামনে চা পান করা অবস্থায় উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক সামুর কোমরে রাখা পিস্তলের একটি ছবি স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশাসনও ছবিটি পেয়েছে। কিন্তু এখনও প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেয়নি।
 
গুলিবিদ্ধ শিশু সৌরভের বাবা সাজু মিয়া জানান, ‘বিচারের জন্যই মামলা করেছি। আইনের আশ্রয় নিয়েছি যাতে আর কোন ভাই বা বাবার সন্তান এভাবে পঙ্গুত্ব বরণ না করে। এখন আপস রফার কোন সুযোগ নেই’। তিনি জানান, মামলা প্রত্যাহার করার জন্য বিভিন্ন কৌশলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।
 
শিশু সৌরভ ঘটনার বিচার চেয়ে বলে, ‘আমার তো কোন দোষ ছিল না, আমি রাস্তায় খেলতে খেলতে ব্যায়াম করছিলাম কিন্তু এমপি এমনিতেই আমাকে গুলি করলো’।
 
এমপি লিটনকে গ্রেফতার ও বিচারের দাবি সংবলিত পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে সুন্দরগঞ্জ পৌর শহরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা। কিন্তু এমপির ক্যাডাররা বিভিন্ন জায়গা থেকে পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেছে বলে জানান আন্দোলনকারীরা।
 
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম জানান, টাকা ছিটিয়ে, ক্যাডার নামিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। এমপিকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে আন্দোলন চলবে। পৌর মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্যাহ আল মামুন জানান, লিটনের ক্যাডার বাহিনীর হুমকির মুখে শান্তিপ্রিয় আন্দোলনকারীরা এখন শংকায় রয়েছে। তিনি প্রধান মন্ত্রীর কাছে অবিলম্বে লিটনের সংসদ সদস্য পদ বাতিল ও দলীয় সভাপতির পদ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান।
 
এমপি লিটনের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার বিরুদ্ধে যাতে মিডিয়াতে সংবাদ প্রকাশ না হয় সেজন্য এমপি লিটনের পক্ষে বেশ কয়েকজন দলীয় ও সাংবাদিক নেতা সাংবাদিকদের ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়েছেন। এজন্য সাংবাদিক মিশনে বাজেট ধরা হয়েছে মোটা অংকের টাকা।
 
গাইবান্ধা পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এমপি লিটনকে গ্রেফতার করতে পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। খোঁজ পেলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে’।
 

গাইবান্ধার-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মো. মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের ছোঁড়া গুলিতে ২ অক্টোবর ভোরে সৌরভ মিয়া (৯) নামে এক শিশু আহত হয়। ওই দিনই সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এমপি তার লোকজন নিয়ে শাহাবাজ গ্রামের হাফিজার রহমানের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। এসব ঘটনায় গত শনিবার রাতে গুলিবিদ্ধ শিশু সৌরভ মিয়ার বাবা সাজু মিয়া বাদি হয়ে এমপিকে একমাত্র আসামি করে থানায় মামলা করেছেন। গত মঙ্গলবার রাতে হাফিজার রহমান বাদি হয়ে তার ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করার জন্য এমপিসহ ১০ জনকে আসামি করে থানায় অপর একটি মামলা দায়ের করেন।