মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। রপ্তানিকারকরা বলছেন, প্রতিযোগী দেশগুলো মুদ্রার অবমূল্যায়ন করায় বাংলাদেশ রপ্তানিতে সক্ষমতা হারাচ্ছে। কিন্তু আমদানিকারকরা টাকা শক্তিশালী থাকায় কিছুটা হলেও স্বস্তিতে আছেন। তবে রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি করায় বাংলাদেশ এক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে বলে মনে করেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। প্রসঙ্গ গত অর্থবছরে (২০১৩-১৪) বাংলাদেশ মোট ৩০ হাজার ১৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আর আমদানি করেছে ৪০ হাজার ৭৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য।
বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করে তৈরি পোশাক। উদ্যোক্তারা বলছেন, এ খাতে মূল্য সংযোজনের হার গড়ে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ। অর্থাত্ বাংলাদেশ যদি একশ’ ডলারের পণ্য রপ্তানি করে তার বিপরীতে ৭০ থেকে ৭৫ ডলারের পণ্য আমদানিও করে। এক্ষেত্রে একজন রপ্তানিকারক তার কাঁচামাল আমদানিতে সুবিধা পেলেও রপ্তানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কম টাকায় ডলার কিনে আমদানি ব্যয় মেটানোর পর একই দামের ডলারে রপ্তানি আয় গ্রহণ করছেন।
গত একবছরে রপ্তানিতে বাংলাদেশের অনেক প্রতিযোগী দেশ মার্কিন ডলারের বিপরীতে তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে। একমাত্র এসময়ে ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকা শক্তিশালী হয়েছে এক দশমিক ৪৫ শতাংশ। সিএনএনমানি সূত্রে জানা গেছে, গত একবছরে চীনা মুদ্রা ইউয়ান ৪ শতাংশ, কানাডিয়ান ডলার ১৭ শতাংশ, ইউরো ১৭ শতাংশ, জাপানি ইয়েন ১৮ শতাংশ, সুইডিশ ক্রোনার ২০ শতাংশ, মেক্সিকান পেসো ২০ শতাংশ, অষ্ট্রেলিয়ান ডলার ২১ শতাংশ, নিউজিল্যান্ড ডলার ২২ শতাংশ, তুরস্কের লিরা ২৪ শতাংশ, ব্রাজিলিয়ান রিয়েল ৩৫ শতাংশ, কম্বোডিয়ান পেসো ৩৭ শতাংশ এবং রাশিয়ার রুবলের ৪৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের টাকা শক্তিশালী থাকায় এক্ষেত্রে রপ্তানিকারকরা সমস্যায় পড়েছেন।
এ বিষয়ে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি এবিএম সামছুদ্দিন বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে আমরা পেরে উঠছি না। আগে মার্কিন ডলারের বিপরীতে আমরা যে পরিমাণ ইউরো পেতাম এখন তার ১৭ শতাংশ কম পাচ্ছি। এমনিতেই নানা কারণে আমরা প্রতিযোগী দেশগুলো থেকে পিছিয়ে আছি। ইউরোর মূল্যপতন আমাদের জন্য মরার ওপর খাড়ার ঘা। তিনি বলেন, একদিকে ডলারের বিপরীতে ইউরোর দাম আমরা কম পাচ্ছি। অপরদিকে ডলারকে বাংলাদেশি টাকায় কনভার্ট করার ক্ষেত্রেও আমরা অন্যান্য দেশ থেকে পিছিয়ে। তিনি রপ্তানিকারকদের জন্য ডলারের পৃথক বিনিময় হার চালুর দাবি জানান।
এদিকে, বাংলাদেশে মুদ্রার ভাসমান বিনিময় হার চালু থাকলেও ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধরে রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। বাজার থেকে ডলার কিনে কৃত্রিমভাবে টাকার মূল্য ঠিক রাখা হচ্ছে। গত একবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে সাড়ে তিনশ কোটি মার্কিন ডলার কিনেছে। তবে, টাকা শক্তিশালী হবার কারণে রপ্তানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আমদানিকারকরা এর মাধ্যমে লাভবান হয়। আমদানি ব্যয় কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য টাকা শক্তিশালী রাখার বিকল্প নেই। এছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও এটি কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে।
এদিকে টাকা শক্তিশালী হবার কারণে শুধু রপ্তানিকারকরাই নয়, যেসব প্রবাসী বিদেশ থেকে অর্থ পাঠান (রেমিট্যান্স) তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যেমন এখন একজন প্রবাসী বাংলাদেশি এক ডলার পাঠালে তার বিপরীতে পাচ্ছেন ৭৭ টাকা ৮০ পয়সা। টাকার অবমূল্যায়ন হলে তারা আরো বেশি অর্থ পেতেন। এ কারণে বিভিন্ন মহল থেকে টাকার অবমূল্যায়নের দাবি জোরদার হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণের চেয়ারপার্সন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশ সবসময় মুদ্রার অবমূল্যায়নকে আমদানিকারক এবং রপ্তানিকারকের দৃষ্টিকোন থেকে দেখেছে। কখন মুদ্রার অবমূল্যায়ন করতে হবে বা কখন অতিমূল্যায়ন করতে হবে সে বিষয়ে আমাদের গবেষণা নেই। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশি মুদ্রা সবসময় আইএমএফ এর নির্দেশিত পন্থায় হেঁটেছে। আমরা আইএমএফ এর কর্মসূচিতে থেকেছি কারণ ঋণের কারণে তারা আমাদের নানা শর্ত দিয়েছে। রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, উত্পাদন, প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানকে মাথায় রেখে বাংলাদেশ মুদ্রা বিনিময় হারের একটি সৃজনশীল পদ্ধতি বের করতে পারে।