প্রায় ৩৪ বত্সর পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের একটি ভবন যেই কারণে ধসিয়া পড়িয়াছিল, সেই অবস্থা আজো বিরাজ করিতেছে দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাসে। বিগত কয়েকমাস ধরিয়া বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় রংপুর সরকারি কলেজের শহীদ মোসলেম উদ্দিন ছাত্রাবাসের দৈন্যদশার খবর প্রকাশিত হইতেছে। ছাত্রাবাসটি প্রায় দুইশত বত্সর পূর্বে নির্মিত। উহা ছিল রংপুর বামনডাঙ্গা কালীধামের জমিদার গুরু প্রসন্ন লাহিড়ীর জমিদার বাড়ি। এখন এই পুরাতন ভবনটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ। দেওয়ালের প্লাস্টার খসিয়া পড়িয়াছে অনেক আগেই। দেওয়ালজুড়ে যেখানে সেখানে গজাইয়া উঠিয়াছে নানা জাতের পরগাছা। ছাদের কংক্রিট খসিয়া বাহির হইয়া পড়িয়াছে মরিচাধরা রড। এমন ভূতুড়ে পরিবেশেই এইখানে এখনো বসবাস করিতেছে ৫০ জন শিক্ষার্থী। অথচ প্রায় আট বত্সর আগে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করিয়া ভবনটিকে দুই দফায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। এমনকি ভবনটি বসবাসের জন্য নিরাপদ নহে বলিয়া রংপুর সিটি করপোরেশনের পক্ষ হইতে ভবনের সামনে সাইনবোর্ড লাগাইয়া দেওয়া হইলেও ওই অর্ধশত শিক্ষার্থী ঝুঁকি লইয়াই বসবাস করিতেছেন।
প্রশ্ন হইল, জীবনের ঝুঁকি লইয়া কেন এত শিক্ষার্থী বসবাস করিতে বাধ্য হইতেছেন? জানা গিয়াছে, ওই শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকেই দরিদ্র পরিবারের। তাহারা জানাইয়াছেন যে, বেসরকারি মেসে থাকিতে জনপ্রতি মাসে দেড় হাজার হইতে দুই হাজার টাকা খরচ হয়, আর ওই ঝুঁকিপূর্ণ ছাত্রাবাসে মাসিক খরচ মাত্র একশত টাকা। অর্থাত্ একশত টাকা খরচ করিয়া তাহারা একঅর্থে জানিয়া-শুনিয়া মৃত্যুকে শিয়রে রাখিয়া বসবাস করিতেছেন। অতিবৃষ্টি কিংবা মৃদু ভূমিকম্পে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিয়া যাইতে পারে। আমরা ইতঃপূর্বে ঝুঁকিপূর্ণ ছাত্রাবাসগুলি লইয়া একাধিকবার সতর্কবার্তা উচ্চারণ করিয়াছি। বড় উদাহরণ হিসাবে ১৯৮৫ সালের জগন্নাথ হল ট্রাজেডি তো রহিয়াছেই। কেবল ছাত্রাবাস নহে, বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, থানা কম্পাউন্ডের কোয়ার্টার এবং হাসপাতাল রহিয়াছে, যেই ভবনগুলি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেই সকল ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলিতেছে কর্মযজ্ঞ এবং বসবাস। রাজধানী ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যাও কম নহে। ২০০৪ সালে পুরনো ঢাকার শাঁখারিবাজারে জরাজীর্ণ ভবন ধসিয়া ১৯ জন মানুষ নিহত হইবার পর কর্তৃপক্ষের সাময়িক সময়ের জন্য টনক নড়ে। তাহার পর অবস্থা পূর্বাবত্। ইহা সত্য যে, কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চাহিলেই ভাঙিয়া ফেলা যায় না। তাহাতে থাকে নানা ধরনের জটিলতা। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকিলে সেই সকল জটিলতা কাটাইয়া উঠা খুব কঠিন কাজ নহে।
তবে রংপুর সরকারি কলেজের শহীদ মোসলেম উদ্দিন ছাত্রাবাসের ক্ষেত্রে কলেজের অধ্যক্ষ জানাইয়াছেন যে, ছাত্রাবাসের জমিটি চিরস্থায়ীভাবে রংপুর সরকারি কলেজের নামে করিয়া নেওয়া এবং সেইখানে নূতন ভবন নির্মাণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হইয়াছে। আমরা আশা করিব, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিশেষ ভূমিকা রাখিবেন যাহাতে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ না হয়।