লোভ যখন আগুনের লেলিহান শিখা

 

২১শে ফেব্রুয়ারি সকালে দেখছিলাম, প্রভাতফেরি করাদের অধিকাংশই সাদাকালো পোশাকে সজ্জিত। অনেকেই ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি গাইতে গাইতে চলছিল। আমি নিজেও গুনগুন করে গাইছিলাম। মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজে পৌঁছে টিচার্স রুমে ঢোকামাত্রই বুকটা কেঁপে উঠল। গলা শুকিয়ে গেল। সব টিভি চ্যানেলের স্ক্রলে, ব্রেকিং নিউজে, মূল খবরে শুধুই পুরনো ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড আর হতাহতের খবর। সকাল ৯টায় শুরু হলো কলেজ মিলনায়তনে শহীদ দিবসের অনুষ্ঠান। ৫২-র ভাষাশহীদদের স্মরণে চকবাজারের চুড়িহাট্টার হতাহতদের হাহাকার, যন্ত্রণা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।

বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল ২০১০ সালের নিমতলী ট্রাজেডি। তখন আমার কর্মস্থল ছিল বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ। মেয়েদের হোস্টেল সংলগ্ন তেজপাতাগলিতে ছিল আমার বাসা। পাঁচতলা ভবনের নিচ তলা বা গ্রাউন্ড ফ্লোরের অর্ধেক অংশ জুড়ে এবং দ্বিতীয় তলার পুরো ফ্লোর জুড়ে ছিল কেমিক্যালের গুদাম। তিন তলা থেকে পাঁচ তলা পর্যন্ত ফ্লোরগুলোর তিনটি ইউনিটে আমরা মোট ৯টি পরিবার ভাড়া থাকতাম। আমরা ভাড়াটিয়ারা অনেকবার বাড়ির মালিকের কাছে অনুরোধ করেছি—দোতলা এবং নিচতলার রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের গুদাম সরিয়ে নিতে। আমরা তাঁকে এই বলেও আশ্বস্ত করেছি—গুদাম সরিয়ে নিলে নিচতলা এবং দোতলা আমরাই আরো বেশি টাকায় ভাড়া নেব। কিন্তু তাঁর সব কথার সারমর্ম ছিল—‘বাড়িভাড়া দিয়ে আর কয় টাকা পাওয়া যায়? কেমিক্যালের গুদাম ভাড়া দেওয়াই মূল ব্যবসা।’

নিমতলী ট্রাজেডির পর যে কয়মাস কেমিক্যাল বোঝাই গুদামঅলা ভবনটিতে থাকতে বাধ্য হয়েছিলাম, সে কয়দিনই আমার মধ্যে একধরনের মৃত্যুভয় কাজ করত। পাঁচতলা থেকে নিচতলা ওঠা-নামার পথে আমি খেয়াল করতাম যেসব শ্রমিক রাসায়নিক দাহ্যকণা বা প্লাস্টিকদানা ভর্তি বস্তা পিকআপ, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি থেকে নামাত কিংবা ওঠাত—তারা, বাড়ির দারোয়ান ও গাড়িচালকরা একসঙ্গে বসে ধূমপান করছে। জ্বলন্ত বিড়ি-সিগারেটের টুকরা এদিক সেদিক ছুড়ে ফেলছে। কেউবা আবার ভবনের দারোয়ানের গ্যাসের চুলোয় (যা একেবারেই গোডাউন সংলগ্ন) চা বানিয়ে খাচ্ছে। গুদামে আমি কখনো ঢুকিনি। তবে খেয়াল করেছি মাল ওঠানো-নামানোর সময় বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানোর প্রয়োজন হতো। গুদামের ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। দুয়েকবার দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি—গুদামের পেছন দিকে মাল নামানোর সুবিধার জন্য একটি দরজা আছে, কিন্তু কোনো জানালা নেই। গুদামের ঠিক বাইরে ছিল পুরো বিল্ডিংয়ের বৈদ্যুতিক সংযোগের মিটার এবং দারোয়ানের থাকার ছোট্ট জায়গাসহ রান্নাঘর। মশার উত্পাত থেকে রেহাই পেতে প্রায়ই সে কয়েল জ্বালিয়ে রাখত। নিমতলীর ট্রাজেডির পর নিচতলা পার হওয়ার সময় নিজের অজান্তেই চোখ যেত দারোয়ানের গ্যাসের চুলা এবং তার খাওয়া বিড়ির টুকরার দিকে। এমনও হয়েছে দারোয়ান নেই কিন্তু গ্যাসের চুলা জ্বলছে। আমি নিজেই চুলাটি বন্ধ করে দিয়েছি অথবা বিড়ির জলন্ত টুকরাটি পায়ে পিষে ফেলেছি। কোনো কারণে ভবনের বৈদ্যুতিক সংযোগে ত্রুটি দেখা দিলে আমরা বাসিন্দারা আতঙ্কে নিচে নেমে আসতাম।

মনে আছে, তত্কালীন সরকার পুরনো ঢাকার আবাসিক এলাকার কেমিক্যালের গুদাম এবং প্লাস্টিক কারখানা উচ্ছেদের জন্য জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু লোভ যাদের নিমতলী এবং চুড়িহাট্টার সর্বগ্রাসী প্রাণসংহারকারী লেলিহান আগুনের শিখার মতো, তাদের কাছে আর কীইবা আশা করা যায়? না হলে কিভাবে চুড়িহাট্টায় নিমতলীর শোকাতুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে?

যে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম সুখী দেশ, যে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে আর্থসামাজিক উন্নয়নের রোল মডেল, তার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা প্রভাবশালী প্রতাপশালী মনুষ্যত্বহীন মানুষগুলোর মাঝে মানবতাবোধ জাগানোর দায়িত্ব আমাদের সবার। মনে রাখতে হবে—বিত্তের চেয়ে মনুষ্যত্ব বড়।

ঢাকা