‘সমাজের অনাচার দূর করতে সংস্কৃতি হোক মৈত্রীর বন্ধন’- এই প্রত্যাশা নিয়ে রাজধানীতে শুরু হয়েছে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন। শুক্রবার সকালে শিল্পকলা একাডেমির উন্মুক্ত মঞ্চে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের আয়োজিত তিন দিনের ৩৮তম এ সম্মেলনের সূচনা হয়। এ সম্মেলনে সারা দেশ থেকে সম্মিলন পরিষদের ৬১টি শাখার সদস্যরা অংশ নিয়েছেন। আর সংগীত প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন সাড়ে চারশ প্রতিযোগী। প্রতিযোগিতার পাশাপাশি চলবে রবীন্দ্রনাথের গান, আলোচনা, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনা।
‘আপন হতে বাহির হতে বাইরে দাঁড়া’ এ সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উত্সবের সূচনা করেন শিল্পীরা। উত্সবের উদ্বোধন করেন কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। পরিষদের সভাপতি সন্জীদা খাতুনের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বুলবুল ইসলাম। ‘আগুনের পরশমণি’ গানের সুরে প্রদীপ প্রজ্বালন করে উত্সবের উদ্বোধন করা হয়।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি ছেলে ও মেয়েরা সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়। কিন্তু এসব সত্ত্বেও এগিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। সেই শুরুটা বোঝা যায় বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলে। সেখানে মেয়েরা এগিয়ে। যে সমাজে নারী-পুরুষ একসঙ্গে এগিয়ে যায় সেই সমাজে অগ্রগতি কেউ রোধ করতে পারে না। বিশ্বের সকল মেয়েকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখবার জন্য।’ প্রাত্যহিক জীবনে রবীন্দ্রনাথের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আমার এমন একটা দিনও কাটে না রবীন্দ্রসংগীত না শুনে। যে মানুষটি রবীন্দ্রসংগীত উপভোগ করতে পারে না তার মতো দুর্ভাগা আর কেউ নেই। ছোটবেলায় দেখেছি, আমাদের বাসায় বয়স্ক লোকের ছবি। সে আমার দাদা বা নানা কেউ নন, তিনি রবীন্দ্রনাথ। সেই শিশুকাল থেকেই আমাদের মাঝে রবীন্দ্রনাথ পড়বার ধারা চালু করেছিলেন বাবা। কিন্তু আমার দুঃখ হয়, নতুন প্রজন্ম পাঠ্যবইয়ে স্থান পাওয়া গল্প কবিতা ছাড়া রবীন্দ্রনাথের অন্য কোনো লেখা পড়ে না।
সন্জীদা খাতুন বলেন, আমাদের সাধনা সিদ্ধির পথে চলেছে। শুরুতে এই সংগঠনের কাজ ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। এখন সারাদেশে ছড়িয়েছে। সংস্কৃতির চর্চা চলছে। সন্জীদা খাতুন বলেন, সংস্কৃতির চর্চা মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়। সমাজের অনাচার দূর করতে সংস্কৃতি একটা আশ্রয়। সেই সংস্কৃতির আশ্রয়ে আমরা সারা দেশের মানুষকে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাই। তিনি আরও বলেন, সারাদেশে রবীন্দ্রসংগীত চর্চা ও প্রশিক্ষণ যে হচ্ছে তা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বুঝতে পারি। বছরের একটা সময়ে এসে পরিচিত মুখগুলো দেখে মনটা ভরে যায়।
বুলবুল ইসলাম বলেন, বিশ্ব নারী দিবসের দিনটিতে এই সম্মেলন শুরু হলো। রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন একজন নারী। ছায়ানট ও রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের মতো দুটি বড় সংগঠনের সভাপতিও একজন নারী। এ দুই ক্ষেত্রেই আমরা নারীর এগিয়ে চলার বার্তা পাই। উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে পরিবেশিত হয় গীতি আলেখ্য ‘বিশ্বভরা প্রাণ’। এর সংগীত পরিচালনায় ছিলেন লাইসা আহমদ লিসা, নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর শুরু হয় কিশোর বিভাগের সংগীত প্রতিযোগিতা। বিকালের অধিবেশনে সংগীত পরিবেশন করে গানের দল রবিরশ্মি। এছাড়াও ছিল আবৃত্তি ও নৃত্যানুষ্ঠান। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শেষ হয় প্রথম দিনের অধিবেশন। আজ শনিবার সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে সকালে অনুষ্ঠিত হবে সাধারণ বিভাগের প্রতিযোগিতা। বিকালে রয়েছে প্রতিনিধি সম্মেলন। এরপর রয়েছে সেমিনার। রবীন্দ্রনাথের গানের ‘সজীব মূর্তি’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করবেন ড. অসীম দত্ত। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।