পূজার ছুটিতে লম্বোক্রো অভিযাত্রা

 
দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের অদম্য বন্ধুরাও এবার গহীন বান্দরবানের শেষ প্রান্তে প্রায় লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা আকাশ ছোঁয়া উঁচু আর ঘন বন-জঙ্গলে ঘেরা লম্বোক্রো পাহাড়ে দুঃসাহসী অভিযানে গিয়েছিলাম।
 
ঘটনা হলো, রাঙামাটি জেলার দুর্গম বিলাইছড়ি উপজেলার পুকুরপাড়া রাইক্ষং ঝরনা দেখা শেষে মাথায় আরও অ্যাডভেঞ্চারের নেশা চেপে বসে। সবাই সিদ্ধান্ত নিই আজ রাতে পুকুর পাড়া কটেজে থাকব না, বগামুখ পাড়া চলে যাব, তাতে আসার সময় ট্র্যাকিং করা উঁচু পাহাড়ে রাতের অন্ধকারে ভিন্ন রকমের থ্রিল অনুভব করা যাবে। সেই অরণ্য ঘেরা বিশাল পাহাড়টির কাছে পৌঁছাতে রাত প্রায় ৮টা বেজে যায়। টর্চের আলোর সাহায্যে প্রায় ২৫০০ ফিট ট্র্যাকিং করে চূড়ার উপরে উঠি। তবে জোত্স্নার আলো যেন দেহের ক্লান্তি অনেকটাই দূর করে দিল! কিছুক্ষণ সেখানে বিশ্রাম নিই। চারপাশে নীরবতা। পূর্ণিমার আলোতে ঢেউ খেলানো সারি সারি পাহাড় দেখার অনুভূতিই অন্যরকম! চারপাশে সব ফকফকা, যত দূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। আমাদের স্বভাবসুলভ আচরণ অনুযায়ী হেসে খেলে আরও প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগবে এই অরণ্যময় পাহাড়টি পারি দিতে। হাইকিং, ট্র্যাকিং, ট্রেইল করার সময়টুকু মন ভরে প্রকৃতি উপভোগ করার কারণে অন্যদের চাইতে আমাদের সময় বরাবরই একটু বেশিই লাগে। এমন ঘন বন-জঙ্গল ঘেরা পাহাড়ে সাধারণত দুঃসাহসী ট্র্যাকার ছাড়া কেউ রাত করে এ পথ মাড়ায় না। আমাদের আগে কোনো অভিযাত্রীর দল রাতের বেলায় কখনো ট্র্যাকিং করেছে কিনা জানা নেই। কিন্তু দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ সবসময়ই ভ্রমণে নতুন কিছু করতে পছন্দ করে।
 
বিশ্রাম শেষে আবারও হাঁটা। শরীরে কারোরই তেমন শক্তি নেই, আছে শুধু মনের জোর। তবে দেশে না ঘুরেই বিদেশের প্রতি আকর্ষণবোধ করে এমন সব পর্যটককে দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি উত্সাহিত করার প্রত্যয়ই হলো আমাদের দুর্গম পথচলার শক্তি।
 
ছোট বড় জঙ্গল, সেগুন, গামারি, টিক চাম্বলের মতো বড় বড় গাছের মাঝে দিয়ে যাচ্ছি। কোথাও কোথাও কাঁটাযুক্ত বুক সমান বুনো গাছ, অবার কোথাওবা ঝুরঝরে পাথুরে মাটির পথ খাড়া ঢাল হয়ে নিচে নেমে গেছে। একটু এদিক সেদিক হলেই পড়ে যেতে হবে প্রায় হাজারো ফিট নিচে। এরমাঝে জোঁকের তাণ্ডব চলছে। কখনো ধীর গতিতে হাঁটি, কখনো দৌড়াই এভাবে কাটছে সময়। আগেও রাত করে ট্র্যাকিং অনেক করেছি কিন্তু এমন জনমানবহীন আর বুনো পরিবেশের পাহাড়ে এবারই প্রথম। বিশাল মোটা গাছের সঙ্গে লতা-গুল্ম এমনভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রথম দেখায় যে কেউ আঁতকে উঠবে। মনে হবে যেন এখনই, মানুষখেকো গাছের মতো এরাও হামলে পড়বে। তবে বিশ্বাস করুন, দিনের চেয়ে রাতের অন্ধকারে পাহাড়ে হাঁটার আনন্দই আলাদা! উঁচু পাহাড়ে কখনো কখনো শুভ্র মেঘমালা আলতো করে ছুঁয়ে দেবে আপনার ক্লান্ত দেহটাকে। যেতে যেতে শুনছি দূর থেকে ভেসে আসা অচেনা জন্তুর কর্কশ কিংবা মায়াবী ডাক, রাত জাগা পাখির মিষ্টি সুর। খুব কাছ থেকেই দেখেছি বিষাক্ত সাপের শিকার করার দুর্লভ দৃশ্য। সব মিলিয়ে রোমাঞ্চে ভরা অ্যাডভেঞ্চার! নিজের অজান্তেই মনের মাঝে খেলে যায় ভয় আর  ভালোলাগার শিহরণ।
 
হঠাৎ দেখি গাইড দ্রুত হেঁটে আমাদেরকে রেখেই এগিয়ে যায়, ভাবি রাত করে ওকে কানাওলা ধরল নাকি? নাম ধরে ডাক দিই, ‘শাহজাহান!’ উত্তর আসে, ‘ইয়েস বস।’ হাত তুলে বলি, ‘দেখ তো কয়টা আঙুল?’ সে সঠিক জবাব দেয়। আমরা তার পিছু হাঁটি। পরে জানতে পারি, আগে আগে থেকে সে পরখ করে নিচ্ছিল কোনো ভয়ঙ্কর জন্তু-জানোয়ার পথে আছে কি না।
 
প্রায় দেড় ঘণ্টা চড়াই-উতরাই পেরোনোর পর বাঁশঝাড় ঘেরা সুড়ঙ্গ আকৃতির ছড়ার দেখা পাই। পুরো পরিবেশটা এমন থমথমে যে ভয়ে গা ছম ছম করে। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বোতলের পানি প্রায় শেষ, সেইসাথে ক্ষুধায়ও পেট চোঁ চোঁ করছে সবার। তাই সাময়িক বিরতি। ছড়ার সুমিষ্ট পানি আর শুকনো খাবারে সমাধান চলে। ততক্ষণে ভুতুড়ে পরিবেশের সাথে নিজেদেরও বেশ মানিয়ে নিয়েছি! নির্জন মায়াবী প্রকৃতির রূপে বুঁদ হয়ে থাকি। টনক নড়ল যখন দেখি ঘড়ির কাঁটায় রাত প্রায় এগারটা। আবারও হাঁটা। এতক্ষণ উপরের দিকে উঠেছি। আর এখন শুধু নিচের দিকেই নামতে হবে। এবারের পথটা যেন আরও বেশি রোমাঞ্চকর। দু-পাশে গভীর গিরিখাত মাঝে বিভিন্ন গাছের শিকড়-বাকড়ের ফাঁক দিয়ে সরু পথ। ঘন অরণ্য ভেদ করে চাঁদের আলো এতক্ষণ গায়ে পড়েনি। এখন সেই চাঁদ তার সবটুকু আলো যেন বিলিয়ে দিলো। গভীর অরণ্যের ফাঁক গলে নিঝুম রাতের চাঁদের আলো আর লক্ষ-কোটি তারার মেলা পুরো পরিবেশটাকে করেছিল অন্যরকম। এমন অপার্থিব সৌন্দর্যের বর্ণনা লিখে কিংবা বলে কারো পক্ষেই বুঝানো সম্ভব নয়, যা শুধু চোখে দেখেই অনুভব করা সম্ভব। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই রাইক্ষং খালে বয়ে যাওয়া জলের কলকল শব্দ পাই। আজ আর বগামুখ পাড়ার দিকে না গিয়ে ঝিরির পানিতে সাফসুতর হয়ে এনোং পাড়াতেই থাকার সিদ্ধান্ত নিই। দিনের আলো ঠিকমতো যে পাহাড়ের গায়ে পড়ে না সেই অরণ্য ঘেরা পাহাড়ে রাতে ট্র্যাকিং করা যে কী দারুণ আনন্দ তা লিখেও বুঝানো সম্ভব না। বুঝতে হলে আপনাকে যেতে হবে লম্বোক্রো পাহাড়ে।
 
 
যোগাযোগ
 
ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান। ভাড়া এসি, নন এসি যথাক্রমে ৬২০ ও ১০০০ টাকা। তারপর রুমা বাস টার্মিনাল থেকে লোকাল বাসে রুমা বাজার। ভাড়া ১০০ টাকা। গাইড নেবে প্রতিদিনের জন্য ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। রুমা থেকে জিপে বগালেক, চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করতে লাগবে ৩৫০০ টাকা। ইচ্ছে করলে অন্যদের সাথে শেয়ার করেও যাওয়া যায়। এক রাত বগালেকে থেকে পরের দিন পায়ে হেঁটে এনোংপাড়া অভিমুখে সকালে বের হলে যেতে যেতে সন্ধ্যা হবে।
 
 
থাকা খাওয়া
 
গাইডের পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন আদিবাসী পাড়াতে মাথা পিছু তিনশত টাকায় থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা রয়েছে। খাবার মেন্যুতে থাকবে মুরগি, ভাজি, ডাল, ভাত।
 
 
খরচপাতি
 
চার দিনের জন্য জনপ্রতি ৫০০০ টাকা হলেই হবে।