সূর্যদি গ্রামে সেদিনও সূর্য ওঠে শীতের মিষ্টি আমেজ নিয়ে। শেরপুরের এক প্রাণবন্ত গ্রাম।
দেশে তখন ঘোরতর মুক্তিযুদ্ধ। বিজয় দ্বারপ্রান্তে, সূর্যদি মুক্তির স্বাদ অনুভব করছে অনেক দিন থেকেই। মুক্তিযোদ্ধাদের কেন্দ্র ও আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। এখনকার জীবনযাত্রা স্বাধীন ভূমির মতো। লোকদের মনে ভয়-আতঙ্ক নেই। হাসিখুশি স্বাভাবিক জীবন।
সূর্য তখন উঠছে। শীতের রোদ তাপানোর জন্য কেউ কেউ এসে বসেছে উঠোনে। এখানে বসেই মুড়ি চিড়ে নাস্তা খাচ্ছে। কেউ কেউ গরু বলদ লাঙল জোয়াল নিয়ে জমি চষতে খেতজমিতে ব্যস্ত হয়ে উঠছে। পুরুরঘাটায় মাছের আশায় জালও ফেলেছে কেউ কেউ। বৌ-ঝিরা সংসারের নিত্য কাজকর্ম নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠছে।
এর ফাঁকেই একজন জানতে চাইল, মুক্তিযোদ্ধারা আজ কেউ রাতে এসেছিল?
ফিসফিস জবাব, এসেছিল। রাতে অপারেশনেও গিয়েছে। এখনো ছয়জন ফিরে এসে ভোর থেকে ঘুমোচ্ছে। একজন মনের আগল খুলে দিয়ে দোয়া করল, আল্লাহ ওদেরকে হেফাজত করুন। পাশে থাকা কয়েকজন সমস্বরে বলে উঠল : আমিন।
হঠাত্ বিকট আওয়াজ। গোলা বর্ষণের। তখন সকাল সাতটা। এত সকালে কে পটকা ফোটায়।
গ্রামবাসীরা কিছু বোঝার আগেই কয়েকজন লুটিয়ে পড়ল।
সাথে সাথে সাড়া পড়ে গেল গ্রামে। কারো আর বুঝতে বাকি নেই ঘটনাটি কী ঘটেছে।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী স্থানীয় রাজাকার-আলবদরদের মাধ্যমে খবর পেয়ে গিয়েছে যে সূর্যদি গ্রাম মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল। তাই ট্রাক জিপ লরি কামান মর্টার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তারা দলেবলে ছুটে এসেছে এই গ্রামকে উচ্ছেদ করতে। গ্রামকে ঘিরে তারা এলোপাথাড়ি গোলা বর্ষণ শুরু করে।
প্রথম দিকে হকচকিয়ে গেলেও পরে সচেতন হয়ে ওঠে গ্রামবাসী। তারা কৌশল খাটিয়ে নীরবে ঘরবাড়ি থেকে বেরিয়ে আশপাশের ঝোপজঙ্গল, ধানখেত, পানের বরজে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
গাঁয়ে কয়েকটা বড় বাড়ি রয়েছে। দেওয়ানবাড়ি। কিরসাবাড়ি। বড়বাড়ি। পাকহানাদাররা সে বাড়িগুলোতে পাউডার ছিটিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আগুন জ্বলে অন্য বাড়িগুলোতেও। সূর্যদি গ্রাম হয়ে ওঠে অগ্নিকুণ্ড। পাকবাহিনী হাতের কাছে যাকেই পায় তাকেই পাকড়াও করে। বিশেষ করে যুবক কিশোরদের। তাদেরকে এনে দাঁড় করানো হয় সরকারি প্রাইমারি স্কুলের মাঠে। ব্রাশফায়ার করা হয় তাদের। জীবন উত্সর্গ করেন ৬২ জন গ্রামবাসী।
গ্রামে তখন ছয় মুক্তিযোদ্ধা। সোহরাব আলী। আবদুল খালেক। ফজলুর রহমান। হাবীবুর রহমান। মমতাজ উদ্দিন। আবুল হোসেন। তাঁরা হিসেব করে দেখলেন তাঁদের হাতে গোলবারুদ রসদ নেই তেমন। ৪৫ রাউন্ড গুলি। এসএমজি। আর কয়েকটা গ্রেনেড। এই নিয়েই তাঁরা প্রতিরোধে নেমে পড়লেন। আশপাশ গ্রামেই ছিলেন গিয়াসউদ্দিন আর তাঁর নেতৃত্ব দুটি দল। তিনি খবর পেলেন সূর্যদি গ্রাম আক্রান্ত। প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন তাঁর কোম্পানির ছয় মুক্তিযোদ্ধা। তিনি তাঁর দুই গ্রুপ নিয়ে এগিয়ে এলেন সূর্যদি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে। গাঁয়ের লোকরাও ধীরে ধীরে ফিরে এসে যোগ দিল মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে।
পালটা আক্রমণে টিকতে না পেরে পাক হানাদাররা পিছু হটল। ফিরে গেল।
সূর্যদির ঘরে ঘরে আগুন। আপনজন হারানোর হাহাকার। এর মাঝেও গ্রামবাসীরা সবাই মিলে হাত লাগাল আগুন নেভাতে। শহীদদের দাফন সারল সম্মিলিতভাবে। বুকে টেনে নিল মুক্তিযোদ্ধাদের।