রাজধানীর পরিবহন ব্যবসা এখন রাজনীতিক ও প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তারা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কিছু রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালী পরিবহন ব্যবসা না করেও মালিক সমিতি কিংবা শ্রমিক সংগঠনের নেতা হয়ে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, দুইটি প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ অনেক নেতাই ঘুরেফিরে রাজধানীর পরিবহন খাতের নীতি ঠিক করেন। আবার তারাই পরিবহন ব্যবসা করেন এবং এই খাতের শ্রমিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে পরিবহন খাতে সরকারের নেয়া সিদ্ধান্ত সহজে বাস্তবায়িত হয় না। কথায় কথায় ধর্মঘট, জ্বালাও-পোড়াও শুরু হয়ে যায়।
সম্প্রতি সরকার বাস ভাড়া বাড়ানোর পর নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছে মতো ভাড়া আদায় করা শুরু করেন বাস মালিকরা। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো হয়। যদিও এর আগে একাধিকবার ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বাস ভাড়ার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনা যায়নি। এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দুই চালককে কারাদণ্ড দেয়ার প্রতিবাদে নগরীতে হঠাত্ বাস বন্ধ রেখে এক দিনের জন্য নরক যন্ত্রণা তৈরি করেন বাস মালিকরা।
বাস মালিকরা রাজনৈতিক নেতা এবং প্রভাবশালী হওয়ার কারণে বিশৃঙ্খলা দমন করা সম্ভব হচ্ছে না। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় নৈরাজ্য ঠেকাতে একাধিক সিদ্ধান্ত নিলেও সেটা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। এছাড়া রাজধানীতে চলাচল করা অধিকাংশ বাসের ফিটনেস নেই। অনেক চালকের লাইসেন্সও নেই। এসব চালক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ হত্যা করলেও কোন বিচার হয় না। পরিবহনের মালিক নেতা বা প্রভাবশালী হওয়ায় রাস্তায় এরা কাউকে পরোয়া করে না।
জানা গেছে, রাজনীতিক ও প্রভাবশালীরা রাজধানীর পরিবহন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন তিন পদ্ধতিতে। প্রথমত, সরাসরি পরিবহনের মালিক হয়ে, দ্বিতীয়ত মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা হয়ে এবং তৃতীয়ত শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারাও অনেক ক্ষেত্রে মালিক হয়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এই ধারায় দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের সমঝোতা চলে আসছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারের মন্ত্রী, প্রভাবশালী নেতা ও সরকারি দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মালিকানাধীন বাস কোম্পানিগুলোই এখন একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে রাজধানীতে। কনক পরিবহনের বাসে একবার বাড়তি ভাড়া আদায় করলে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভাই মালিক জেনে শুধু জরিমানা করে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এই বিষয়ে গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদও প্রচারিত হয়। মিরপুর থেকে সদরঘাট চলাচলকারী বিহঙ্গ পরিবহনের চেয়ারম্যান সরকার দলীয় একজন সংসদ সদস্য ও একটি সহযোগী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। অভিযোগ আছে, ওই পথে আগে থেকেই ইউনাইটেড কোম্পানির বাস চলাচল করত। রীতি অনুযায়ী একই যাত্রা ও গন্তব্যে একাধিক কোম্পানিকে অনুমোদন দেয়া হয় না। বিহঙ্গের ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানা হয়নি।
আজিমপুর-টঙ্গী রুটে চলাচলকারী দুলদুল পরিবহনে একজন মন্ত্রীর বাস আছে বলে জানা গেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক একজন হুইপের চাচাতো ভাইয়ের বাস আছে আজিমপুর থেকে আবদুল্লাহপুর পথে চলাচলকারী সূচনা বিআরএফ পরিবহনে। বিএনপির নেতা এবং চারদলীয় জোট সরকারের একজন দাপুটে মন্ত্রীর বাস ছিল ঢাকা পরিবহনে। বর্তমান সরকারের আমলে অবশ্য তার বাস চলে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চারদলীয় জোট সরকারের একজন প্রথম সারির নেতা ও পরিবহন ব্যবসায়ী বলেন, এই খাতে নোংরামি ঢুকে গেছে। তাই তিনি অনেক আগেই সরে এসেছেন। তার দাবি, তিনি পরিবহন নেতা থাকা অবস্থায় এতো চাঁদাবাজি-বিশৃঙ্খলা ছিল না।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের গণপরিবহনগুলো আইন-কানুন কিছুই তোয়াক্কা করে না। আর এখানে মালিকদের এমন একটা শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে যারা কোন না কোন রাজনৈতিক আশ্রয়ে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
একই অনুষ্ঠানে সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নামে যে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের মতামত উপেক্ষা করেছে সরকার। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির অবৈধ আবদার রক্ষায় বিআরটিএ ভাড়া বাড়ানোর কাজটি করেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনু মোহাম্মদ বলেন, অযৌক্তিকভাবে গ্যাস ও তেলের দাম বাড়ানোর কারণেই এ ভাড়া নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। সরকার যে পরিমাণ ভাড়া বাড়িয়েছে তার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করছে বাস মালিকরা। কারণ বেশির ভাগ বাসের মালিক সরকার সংশ্লিষ্ট।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে অভিযান প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম জানান, আমরা বেশিরভাগ সময়েই মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেই। তাদের শোকজ, আর্থিক জরিমানা করা হয়। এবার কিছু বাসের রুট পারমিটও বাতিল করা হয়েছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, রাজনৈতিক দলের নেতাদের হাতে নয়, ব্যবসায়ীদের হাতেই পরিবহন ব্যবসা আছে। এটা গুজব ছাড়া কিছুই নয় বলে তিনি দাবি করেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, অন্যান্য অনেক খাতের মতো পরিবহন খাতের মালিকানাও প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে রাজনীতিক এবং প্রভাবশালীদের হাতে। অনেক রাজনীতিক তার রাজনৈতিক অবস্থানকে ব্যবসায়িক মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। তবে রাজনীতিকে ব্যবসার হাতিয়ার করার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।