টাকা ও মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে হোটেলকর্মী রিয়াদকে (১৭) গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে রাজধানীর মতিঝিলে ‘ঘরোয়া হোটেল এ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’র মালিক আরিফুল ইসলাম সোহেলের বিরুদ্ধে।
শুধু তাই নয়, হত্যার পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে ছিনতাইয়ের নাটক সাজানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। নিজের লাইসেন্সকৃত পিস্তল দিয়ে হোটেল কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ ধারণা করছে। মঙ্গলবার রাত ১২ টার দিকে ওয়ারীর ৭৩, স্বামীবাগের একটি নির্মাণাধীন বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর হোটেল মালিক আরিফুল ইসলাম সোহেল পলাতক রয়েছেন। পুলিশ হোটেলের ম্যানেজার ও ওই হোটেলের ১৫ জন কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। হত্যার ঘটনার পর পুলিশ ঘরোয়া হোটেল আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, এই হত্যার সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ জব্দ করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থলের পাশে ঢাকা মহানগর বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম লীগের অফিসের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজে কিভাবে রিয়াদকে সেখানে আনা হয়েছে এবং হত্যার পর কিভাবে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেই দৃশ্য এখন পুলিশের হাতে। নিহতের বড়ভাই রিপন জানান, সাড়ে ৩ বছর ধরে তার ছোটভাই রিয়াদ ঘরোয়া হোটেল এ্যান্ড রেস্টুরেন্টে কর্মী হিসাবে কাজ করছিল। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮ টার দিকে তার ভাইয়ের মোবাইলে ফোন করলে, অজ্ঞাত ব্যক্তি রিসিভ করে জানায় যে, রিয়াদকে হাত-পা বেঁধে হোটেলের পিছনে দোতলার ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি ওই হোটেলে যাওয়ার পর দেখেন যে তার ভাইকে হাত-পা বেঁধে একটি ঘরের ভিতর আটকে রাখা হয়েছে। হোটেল কর্মচারীরা জানান, রিয়াদ আরেক কর্মচারীর দেড় হাজার টাকা ও মোবাইল সেট চুরি করেছে। এই অভিযোগে হোটেলের মালিক তার হাত-পা বেঁধে বেদম মারপিট করেন। পরে রিপন চুরির ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেখান থেকে চলে যান। রিপন আরো জানান, রাত ২ টার দিকে হোটেল কর্মচারী জসীম তার মোবাইল ফোনে কল করে জানান যে, হোটেল মালিকের ২ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে সিএনজি অটোরিকশায় শান্তিনগরে পীরসাহেবের গলিতে যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীর গুলিতে রিয়াদ নিহত হয়েছে। রিপন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে তার ভাইয়ের লাশ দেখতে পান।
ওয়ারী থানার এসআই আব্দুল খালেক জানান, প্রাথমিক তদন্তে দেড় হাজার টাকা ও একটি মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে ঘরোয়ার মালিক সোহেল নিজেই তার কর্মী রিয়াদকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ মিলেছে। ঘটনা ধামাচাপা দিতে ছিনতাইকারীর গুলিতে রিয়াদ নিহত হয়েছে- এমন নাটক সাজাতে তিনি দুই হোটেল কর্মীকে শিখিয়ে দেন। তার শেখানো কথাই পরে হোটেলকর্মী জসীম ও রাজু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গণমাধ্যম কর্মীদের জানান। তারা জানান, মঙ্গলবার রাতে কাজ শেষে হোটেলের ২ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে মালিক আরিফুল ইসলাম সোহেল তার শান্তিনগরের পীরসাহেবের গলির বাসায় যাচ্ছিলেন। শাপলা চত্বরে তাদের বহনকারী অটোরিকশাকে থামার সিগন্যাল দেয় দুর্বৃত্তরা। অটোরিকশাটি না থামলে তারা সিএনজি লক্ষ্য করে গুলি চালায়। রিয়াদের থুতনিতে গুলি লাগে। আহতাবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করেন। এসআই আব্দুল খালেক জানান, নিহত রিয়াদ ও তার সহকর্মীরা ঘরোয়া হোটেলের মালিকের স্বামীবাগের মিতালী স্কুলের পাশে একটি নিমার্ণাধীন বাসায় একসঙ্গে থাকত। সেখানে রিয়াদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় হোটেলের ম্যানেজার শফিকুল ইসলামকে আটক করা হয়েছে।
বড়ভাই রিপন জানান, ওই হোটেলের একজন কর্মচারী তাকে জানিয়েছেন, রাত ১২টার দিকে হোটেল মালিক নিজে রিয়াদকে তার গাড়িতে করে স্বামীবাগের ওই বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে নির্যাতনের পর তার থুতনিতে পিস্তল ঠেকিয়ে টাকা ও মোবাইল ফোন দিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়। এসময় রিয়াদ চুরির কথা অস্বীকার করলে মালিক গুলি চালান। নিহত রিয়াদের বাড়ি চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের হাড়িয়া গ্রামে। বাবার নাম মৃত মফিজুল ইসলাম। গতকাল বুধবার বিকালে এ ঘটনায় রিপন বাদী হয়ে আরিফুল ইসলাম সোহেলকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপ-কমিশনার নুরুল ইসলাম বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, লাইসেন্সকৃত পিস্তল দিয়ে রিয়াদকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তবে হোটেল মালিক পলাতক থাকায় বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।