পুরো পথ নির্বিঘ্নে এসে যত ভোগান্তি কাঁচপুরে

কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা কিংবা চাঁদপুর থেকে ঢাকায় আসার পথে এখন অস্বাভাবিক কোনো যানজট বা দুর্ভোগ নেই বললেই চলে। তবে পুরো পথ প্রায় নির্বিঘ্নে আসার পর যাত্রীদের কিংবা যানবাহনকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে কাঁচপুর ব্রিজে ওঠার সময়। ফেনীর মহিপাল থেকে মেঘনা সেতু পার হয়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও পর্যন্ত পৌঁছুতে সাধারণত তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় লাগছে। অথচ দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দেয়ার পর শুধু কাঁচপুর ব্রিজে উঠতেই লেগে যাচ্ছে দুই থেকে ৩ ঘণ্টা। কখনও কখনও এই সময় আরো দীর্ঘায়িত হয়। কাঁচপুর ব্রিজের এই জট প্রায়ই দীর্ঘায়িত হচ্ছে মেঘনা সেতু পর্যন্ত।
 
গত এক মাসে এই প্রতিবেদক তিনবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাতায়াত করে ভোগান্তির এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। সর্বশেষ গত ১৬ অক্টোবর ভোর সোয়া ৬টায় ফেনীর মহিপাল থেকে বাসযোগে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে ৯টার দিকে মেঘনা সেতু পার হন প্রতিবেদক। সোনারগাঁওয়ের মোগড়াপাড়ায় এসে যানজটে পড়ে বাস। কাঁচপুর ব্রিজে উঠতেই লেগে যায় প্রায় দুই ঘণ্টা। যানজটের কারণ অনুসন্ধানে বাস থেকে নেমে দেখা যায়, কাঁচপুর ব্রিজে ওঠার সময় মূল সড়কের দুই পাশেই অর্ধেক স্থান দখল করে বাজার বসেছে। বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাসহ সাধারণ মানুষের ভিড়ের কারণে সড়ক সরু হয়ে গেছে। আর এ কারণেই যান চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
 
পরবর্তীতে এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাঁচপুর ব্রিজ থেকে চট্টগ্রামের দিকে যেতে সড়কের উভয় পাশে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী মার্কেট। প্রায় তিন হাজার দোকান রয়েছে এখানে। সড়কের জায়গা দখল করে কেউ কেউ রীতিমতো পাকা দোকান-মার্কেটও বানিয়ে ফেলেছেন। ফুটপাতেও নিয়মিত পসরা সাজিয়ে বসছেন ভ্রাম্যমাণ হকাররা। আর পুরো এলাকায় যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
 
ফেনী থেকে ঢাকায় ফেরার পথে কাঁচপুরে নেমে কয়েকজন দোকানদার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, দেশের অন্যতম ব্যস্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট এবং বাস্তবায়নাধীন এশিয়ান হাইওয়ে প্রকল্পের মোহনাস্থল হচ্ছে কাঁচপুর। এই এলাকায় তৈরি পোশাকের কারখানাসহ তিন শতাধিক ছোট-বড় শিল্প-কারখানা রয়েছে। এগুলোতে কাজ করছেন ৩ থেকে ৪ লাখ শ্রমিক। সকালে শ্রমিকরা কর্মস্থলে যেতে এবং বিকেলে বা সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় বেশিরভাগই হেঁটে যাতায়াত করেন। কিন্তু ফুটপাত ও সড়কের দুই পাশের বেশিরভাগ জায়গা বেদখল করে মার্কেট তৈরি হওয়ায় মূল সড়কে যান চলাচলের জায়গা দিয়েই হাঁটতে হচ্ছে তাদের। এটিও সেখানে সকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিত ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার যানজট লেগে থাকার অন্যতম কারণ।
 
স্থানীয়রা ইত্তেফাককে জানান, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় কতিপয় নেতা-কর্মী মিলেমিশে এসব অবৈধ মার্কেট স্থাপন করেছেন। ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে প্রতিদিন ২শ’ টাকা করে চাঁদা নেয়া হয়। আর স্থাপনায় যারা দোকান নিয়েছেন তাদেরকে অগ্রিম হিসেবে দিতে হয়েছে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা করে। পুলিশ মাঝে-মধ্যে এসব দোকান ভেঙ্গে দিলেও কয়েকদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এতে বরং নতুন করে দোকান   ভাড়া ও নির্মাণের জন্য অগ্রিম টাকা গুনতে হয় দোকানদারদের। গত ১০-১২ বছর ধরে এই অবস্থা চলে আসছে। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও দখলদাররা এখানে দল-মত নির্বিশেষে মিলেমিশে সড়ক দখলে রাখেন।
 
স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রফিক ওই এলাকায় বসবাস করছেন গত ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তিনি জানান, অবৈধ দখলদারদের নেতৃত্বে রয়েছেন কাঁচপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল হক। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আর তার সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কারও কারও। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের স্থানীয় কতিপয় কর্মকর্তাও এর সঙ্গে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে খোদ কাঁচপুর হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধেও।
 
অভিযোগ প্রসঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘সিঅ্যান্ডবি এসব জায়গা লিজ দেয়। প্রভাবশালীরা সড়কের জায়গা দখল করে রেখেছে। তারা ঘর তুলে ভাড়া দেন। এর সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই।’
 
সোনারগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, ‘অবস্থা এমন যে আমরা উচ্ছেদ করতে গেলে বাধা আসে। এখানে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ লাগবে।’ আর কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ওসি মাহবুবুর রহমান জানান, ওই এলাকায় চারটি সিগন্যাল। এশিয়ান হাইওয়ের জন্য রাস্তা কেটে ফেলায় এখন কাঁচপুর সড়কে যানবাহনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সিগন্যাল ছাড়লে আগে যেখানে মিনিটে ২০/৩০টি গাড়ি পার হতো, সেখানে এখন পার হচ্ছে ২/৩টি। এর ফলে যানজট ও ভোগান্তিও বেড়েছে। তবে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি দাবি করেন।
 

স্থানীয়রা জানান, সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনা অপসারণের দাবি জানিয়ে গত ৭ অক্টোবর সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু নাছের ভূঁইয়ার কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে এখনও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।