আলোচনার কেন্দ্রে আনসারুল্লাহ

এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত নাম আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। সর্বশেষ জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যার পর এই জঙ্গি সংগঠনের নামটি আরো জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে। বিজ্ঞানমনষ্ক লেখক ড. অভিজিত্ রায়কে হত্যার ঘটনায় এই বাংলা টিমের সদস্যদেরই সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে গোয়েন্দাদের চালানো তদন্তে তথ্য মিলেছে। ফলে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও অনেক। গোয়েন্দাদের অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে কিভাবে কাজ করে আনসারুল্লাহ, কিভাবে সংগ্রহ করে সদস্য। আর তাদের উদ্দেশ্যই বা কি—তাও উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। আনসারুল্লাহ’র সদস্যরা কোন কিলিং মিশন বাস্তবায়নের সময় মোবাইল ফোন বা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধ রাখে বলে জানা গেছে।

 
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এ পর্যন্ত তারা ৪২ জনের মতো আনসারুল্লাহ সদস্যকে গ্রেফতার করেছেন। তাদের দেয়া তথ্যমতে, আনসারুল্লাহ বা একই ধরনের অন্য সংগঠনগুলো বিকশিত হওয়ার ধাপ চারটি। প্রথম ধাপ হচ্ছে দাওয়াত। এই ধাপে তারা মানুষকে জিহাদে অংশ নেয়ার আহ্বান জানায়। দ্বিতীয় ধাপে আছে ইদাদ। এই ধাপে তারা আনসার তৈরি করে। এই ধাপে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। তৃতীয় ধাপ হচ্ছে রিবাত। এ পর্যায়ে হামলার পরিকল্পনা ও গোপন জায়গা থেকে বার্তা পাঠিয়ে হামলার দায় স্বীকার করার কথাও বলা আছে। শেষ পর্যায়ে হচ্ছে ‘কতল’। তাদের মতে, ‘জিহাদ’ ব্যর্থ হলে নির্বিচার হত্যা বা ‘কতল’ অনিবার্য। এ পর্যন্ত ব্লগার, প্রকাশক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ অন্তত ৮টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত থাকার পক্ষে তথ্য মিলেছে। 
 
সদস্য সংগ্রহ এক প্রক্রিয়ায় করা হলেও তাদের কাজের ধরনের জন্য রয়েছে কয়েকটি ধাপ। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম আল-কায়েদার অনুসরণে অনেক ‘স্লিপার সেলে’ ভাগ হয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। সাত থেকে আটজন সদস্য নিয়ে একেকটি সেল গঠিত। একটি সেলের কাজ ও সদস্যদের বৃত্তান্ত অন্য সেলকে অবগত করা হয় না। এ ছাড়া আনসারুল্লাহর ‘একাকী মুজাহিদ’ রয়েছে বলেও জানা গেছে। এ পদ্ধতিতে তারা এখন পর্যন্ত একটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এই পদ্ধতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণের জন্য একজনকে উদ্বুদ্ধ এবং প্রস্তুত করা হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘একাকী মুজাহিদ’ সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ, এ ক্ষেত্রে আগাম গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকে না। এ পদ্ধতিতে হামলায় একজনকে যুক্ত করা হয়। কখনও ২/১ জনকে সহযোগী রাখা হলেও পুরো পরিকল্পনা জানানো হয় না। শুধু ওই একজনই জানে কি করতে হবে, কিভাবে করতে হবে।
 
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম কয়েকদিন আগে বলেছেন, বুয়েটের ছাত্র আরিফ রায়হান দ্বীপকে হত্যা করেছে ‘একাকী মুজাহিদ’। ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল দ্বীপকে বুয়েট ক্যাম্পাসে কুপিয়ে আহত করা হয়, পরে তিনি হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মেজবাহ উদ্দিন নামে বুয়েটের এক ছাত্রকে গ্রেফতার করার পর তিনি স্বীকার করেন, তিনি একাই দ্বীপকে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেন।
 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরুর পর থেকে আনসারুল্লাহ তাদের বিভিন্ন ব্লগ ও ওয়েবসাইটে ‘নাস্তিকবিরোধী’ প্রচারণা শুরু করে। তাদের ভাষায় ‘নাস্তিক ব্লগারদের’ কতল করা ‘ফরজ’ উল্লেখ করে আনসারুল্লাহর প্রধান মুফতি জসীমুদ্দীন রাহমানীর ওয়াজ ও খুতবার ভিডিও ওয়েবসাইটে দেয়া রয়েছে। জসীমুদ্দীন রাহমানী ব্লগার রাজীব হত্যা ও ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীন হত্যাচেষ্টা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। দুই মামলায় আসামিরা জবানবন্দিতে বলেছেন, তারা রাহমানীর ওয়াজ ও খুতবা শুনে ‘নাস্তিক ব্লগার’ হত্যায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।
 

ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যার মধ্য দিয়ে পৌনে তিন বছর আগে আলোচনায় এলেও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের যাত্রা শুরু ২০০৮ সালে। এর সদস্যরা মূলত শহরের সচ্ছল পরিবারের সন্তান এবং সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করা। জানা গেছে, ২০০৮ সালে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক ক্যাম্পাসের কাছাকাছি বনানীর একটি মসজিদকে ঘিরে আল-কায়েদার মতাদর্শে বিশ্বাসী এ গোষ্ঠীর কার্যক্রম শুরু হয়। প্রধানত ইংরেজি মাধ্যম বা আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে মতাদর্শ প্রচার, উদ্বুদ্ধকরণ, পাঠচক্র পরিচালিত হতো। পরে বিভিন্ন ওয়েবসাইট, ফেসবুক, ব্লগ ব্যবহার করে তত্পরতা শুরু করে।