অঞ্জন রায় চৌধুরী
ভারত বলেছে, যদি পাকিস্তান কাশ্মিরে ‘নয়া পাকিস্তান’ সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে ভারত ‘নয়া অ্যাকশন’ শুরু করবে। পাকিস্তানের মাটিতে ঘাঁটি গড়ে তোলা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহূত অবকাঠামো ধ্বংস করে দেবে। ভারতীয় সীমান্তে চিরতরে সন্ত্রাসবাদের অবসান ঘটাবে।
মূলত জইশ-ই-মুহাম্মদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সে ব্যাপারে গতকাল শনিবার সকালে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র। সেখানে বলা হয়, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি জম্মু কাশ্মিরের পুলওয়ামায় যারা জঘন্য হামলা চালিয়েছে, তারা হলো পাকিস্তানভিত্তিক ও জাতিসংঘ কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জইশ-ই-মুহাম্মদ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর মুখপাত্রও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত আমাদের অসামরিক অভিযানের অভীষ্ঠ লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। নিজেদের মাটিতে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো পরদিন ২৭ ফেব্রুয়ারি আমাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে কয়েকবার হামলার ব্যর্থ চেষ্টা চালায় পাকিস্তান। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের সামরিক অবকাঠামোতে হামলা করা। কিন্তু আমাদের সেনাবাহিনীর সতর্ক অবস্থানের কারণে তারা পরাজিত হয়েছে।’
‘আমরা স্বচ্ছ ও খোলামেলাভাবে সংবাদমাধ্যমকে জানাতে চাই যে, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত সংহতি রক্ষায় অভিযান চালানো হলে একটি মিগ-২১ বিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। উইং কমাণ্ডার অভিনন্দন বিমানটি থেকে সফলভাবে বেরিয়ে আসেন এবং পাকিস্তান অধীকৃত জম্মু কাশ্মীরে অবতরণ করেন। কিন্তু সেই দিনের ঘটনার মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে। আমাদের মাত্র একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। অথচ পাকিস্তান ভারতের দ্বিতীয় আরেকটি বিমান ভূপাতিত করার দাবি করছে। তারা বলছে, এই ব্যাপারে তাদের ভিডিও রয়েছে। তবে এই ঘটনার এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে তারা সেই ভিডিওটি দেখাতে পারছেন না কেন? তাদের প্রশ্ন করা উচিত সেই বিমানের ধ্বংসাবশেষ কোথায় গেল এবং পাইলটের ভাগ্যেই-বা কী ঘটেছে?’
‘আমরা ইতোমধ্যেই বলেছি যে, পাকিস্তান এফ-১৬ বিমান পাঠিয়েছিল এবং উইং কমাণ্ডার অভিনন্দন তা ভূপাতিত করেন। এ ব্যাপারে প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও ইলেকট্রনিক তথ্য প্রমাণাদি আছে। এফ-১৬ বিমান ভূপাতিত করার বিষয়টি পাকিস্তান কেন অস্বীকার করছে তার ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। ভারতের বিরুদ্ধে এফ-১৬ বিমান ব্যবহার করা হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বিমান বিক্রয়ের শর্ত অনুযায়ীই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলেছি।’
‘পুলওয়ামা আক্রমণের পর থেকে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় ভারতের পক্ষে সংহতি প্রকাশ করেছে। তারা পাকিস্তানকে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ একটি বিবৃতি দিয়েছে যেখানে এই ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়েছে জইশ-ই-মুহাম্মদকে। তারা সন্ত্রাসবাদে জড়িত অপরাধী, সংগঠক ও অর্থলগ্নিকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু জইশ-ই-মুহাম্মদই যে এই হামলার সাথে জড়িত তা পাকিস্তান এখনও অস্বীকার করে চলেছে।’
২০০৪ সালে পাকিস্তানের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট একটি আড়ম্বরপূর্ণ অঙ্গীকার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো ভূখণ্ড কোনোভাবেই কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহূত হতে দেবো না।’ কিন্তু আজ পর্যন্ত পাকিস্তান জইশ-ই-মুহাম্মদ ও অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও পাকিস্তান এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের এরূপ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান আবারও দাবি করছে যে, তারা তাদের মাটিতে থাকা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমার জানা মতে, সে (মাসুদ আজহারি) পাকিস্তানে আছে’। বলা হয়, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে। কাউকে কাউকে আটক করা হবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই করা হয়নি।
উল্লেখ্য, এর আগেও এমন নাটক করা হয়েছে। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে সন্ত্রাসীরা ভারতের পার্লামেন্টে আক্রমণ করে। ২০০৮ সালের নভেম্বরে মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে হামলা চালানো হয়। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে হামলা চালানো হয় পাঠানকোটের এয়ারবাসে। এইসব হামলার ঘটনায় পাকিস্তান দাবি করে যে, কিছু কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তা আজ পর্যন্ত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ আছে। প্রকৃতপক্ষে সন্ত্রাসীরা কোনো প্রকার বাধা ছাড়াই তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। এমতাবস্থায়, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, ভারত ও আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের আহ্বানকে আমলে নিয়ে পাকিস্তান কোনো সিরিয়াস পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি পারভেজ মোশাররফের স্বীকারোক্তির পরও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র পাকিস্তানে জইশ-ই-মুহাম্মদের উপস্থিতিকে সরাসরি অস্বীকার করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনী কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখবে এবং আমাদের দেশ ও নাগরিকদের নিরাপত্তায় অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকবে।’
ইংরেজি থেকে অনুবাদ :ফাইজুল ইসলাম
n লেখক : ইত্তেফাকের নয়াদিল্লি প্রতিনিধি