জামিউল আহসান সিপু
লাশ উদ্ধারের ১০ মাস পরও পুলিশ নিশ্চিত হতে পারেনি মৃত্যুর কারণ। দুই সন্তানকে হত্যার পর মা আত্মহত্যা করেছেন— এমন ধারণা নিয়ে পুলিশ তদন্ত করে যাচ্ছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী পুলিশ বলছে, দুই সন্তানকে হত্যা করে মা আত্মহত্যা করেছেন। গত বছরের ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যায় দারুস সালাম থানা এলাকার পাইকপাড়া সি-টাইপ সরকারি কোয়ার্টারের ১৩৪নং ভবনের চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার (৩৫) এবং তার দুই মেয়ের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো মামলা বা জিডি হয়নি। ঘটনার এক সপ্তাহ পর পুলিশ দারুস সালাম থানায় একটি জিডি করে। ১০ মাস ধরে পুলিশ সেটির তদন্ত করছে।
এ ব্যাপারে দারুস সালাম জোনের সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তদন্তে এখনো কিছুই পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মন্তব্য ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আমরা একটি চিরকুট পেয়েছি। চিরকুটের হাতের লেখা জেসমিন আক্তারের। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, নিহতদের শরীরে যেসব আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, তাতে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত জেসমিন আক্তারের স্বামী হাসিবুল হাসান জাতীয় সংসদের সহকারী লেজিসলেটিভ ড্রাফটসম্যান। দুই মেয়ে হাসিবা তাহসিন হিমি (৮) ও আদিবা তাহসিন হানিকে (৫) নিয়ে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যায় হাসিবুল স্থানীয় মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করে বাসায় ফিরে দেখেন বেডরুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। পরে হাসিবুল ও তার শ্যালক শাহীনুর মিলে দরজা ভেঙ্গে মেঝেতে তিনজনের রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখেন।
তিনজনের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, জেসমিনের গলা ছাড়াও দুই হাতে কবজির কাছে কাটা ছিল। বুকে ছিল অন্তত ৯টি আঘাতের চিহ্ন। বড় মেয়ে হিমির পেটে তিনটি আঘাতের চিহ্ন এবং বাঁ হাতের কবজির কাছে কাটা ছিল। ছোট মেয়ে হানির পেটে এবং ডান হাতের কবজির কাছে কাটা ছিল। দুজনেরই গলা কাটা ছিল। একজন পুলিশ কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, একজন ব্যক্তি দুই জনকে হত্যা করে দুই হাতের কবজিতে ছুরি দিয়ে আঘাত করা সম্ভব নয়। এক হাতের কবজিতে ছুরি দিয়ে জখম করার পর অপর হাতে জখম করা সম্ভব নয়। এরপর গলা বা বুকে আঘাত করাও সম্ভব নয়।
পুলিশ জানায়, মৃত্যুর আগে জেসমিন তার অফিসে একটি চিরকুটে লিখে যান। ওই চিরকুটটি পুলিশ তার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফিসের টেবিলের ড্রয়ার ভেঙে উদ্ধার করে। চিরকুটে লেখা ছিল, ‘আমি বেঁচে থাকার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। আমার সব দিক থেকে অনেক অন্ধকার নেমে এসেছে। তাই এ সিদ্ধান্ত নিতে হলো। আমার মৃত্যুর জন্য আমার নির্মম দুর্ভাগ্য দায়ী।’
ঘটনাটি তদন্তকালে নিহেতর স্বামী হাসিবুল বলেন, জেসমিন আক্তারের মাইগ্রেনের সমস্যা ছিল। ব্যথা উঠলে চিত্কার করতেন। এরই মধ্যে ঢাকায় দুজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সককে তারা দেখিয়েছিলেন। লাশ উদ্ধারের ঘটনার আগে জেসমিন তার দুই সন্তানকে ঘুমের ওষুধও খাইয়েছিলেন। মাথা ব্যথায় অনেক সময় জোরে জোরে চিত্কার চেঁচামেচিও করতেন। বাধ্য হয়ে তিনি তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে বলেছিলেন।
পুলিশের দারুস সালাম জোনের সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম গতকাল বলেন, সব বিষয় মাথায় রেখে আমরা তদন্ত করছি। ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বলেই আমরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করছি।