শব্দ দূষণ দু’ভাবে হয়ে থাকে; যেমন—প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট। তবে শব্দ দূষণের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক উেসর চেয়ে মনুষ্যসৃষ্ট কারণই অধিক দায়ী। সাধারণত বজ্রপাত, মেঘের গর্জন, ঝড়-বৃষ্টি, জলপ্রপাত ইত্যাদি প্রাকৃতিক উেসর আওতায় পড়ে। আর মনুষ্যসৃষ্ট উত্স হলো মারাত্মক। এই ধরনের শব্দদূষণ মনুষ্য দেহ ও মনের ওপর প্রভূত প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এদিকে দূষণের এই প্রভাবকে মোটামুটিভাবে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়ে থাকে; যেমন-ক্ষণস্থায়ী বা অ্যাকিউট প্রভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক প্রভাব। ক্ষণস্থায়ী প্রভাব হিসেবে কর্ণপটের ক্ষতিসহ কর্ণপট ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কারণে সাময়িক শ্রবণ ক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং মস্তিষ্কে শ্রবণ উদ্দীপনা পরিবহনকারী নার্ভের কর্মক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে বধিরতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, লাগাতার মাত্র ৬০ ডেসিবেল শব্দে মানুষের সাময়িক শ্রবণশক্তি নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং ১০০ ডেসিবেল শব্দে চিরতরে শ্রবণশক্তি হারানোর বিষয়টি খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। অথচ রাজধানী ঢাকার বেশিরভাগ স্থানে ১০৭ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দও মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ মাত্রার শব্দের মধ্যে বাস করতে করতে মানুষের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের ছন্দপতন হয়ে স্বভাব ও মেজাজ খিটখিটে এবং মারমুখী হয়ে দাঁড়ায়।
উল্লেখ্য যে, একজন অস্ট্রেলীয় ভদ্রলোক প্রায়ই তার পাশের প্রতিবেশী বাড়ির টিভি থেকে জানালা দিয়ে ভেসে আসা অস্ট্রেলীয় অপেরার ‘থিম সং’-এর উচ্চ শব্দে বিরক্ত হয়ে পড়েন। আর ক্রমান্বয়ে তা অসহনীয় বিরক্তিকর পর্যায়ে রূপ নেয়। একদিন তা সহ্য করতে না পেরে সে প্রতিবেশীকে খুন করে বসে। আর এই ঘটনাকে কোনোক্রমেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যাবে না। কেননা ‘রাইট টু পিস অ্যান্ড কোয়ায়েট ক্যাম্পেইন’-এর তথ্য মতে, এই শব্দদূষণকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনে প্রতি বছর অন্তত পাঁচজন মানুষ খুন হয়ে থাকে। এদিকে ভারতের কানপুরে এ রকমের এক আজব হত্যাকাণ্ড ঘটে। তা ছাড়া সুদূর আমেরিকাতেও এমন এক ধরনের ঘটনায় ক্রীড়ারত শিশুর ওপর বিরক্ত হয়ে প্রতিবেশী বন্দুক দিয়ে তাকে গুলি করে বসে। সম্মানিত পাঠকবর্গ বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না; এ ধরনের অনেক ঘটনা এ বিশ্বে প্রতিনিয়ত ঘটছে; যার বেশিরভাগই আমাদের কাছে অজানা থেকে যায়। তবে আশার কথা এই যে, এর মধ্যে সুরবর্জিত শব্দে বিশ্ব বিবেকের ঘুম ভেঙে গিয়েছে এবং এরই সূত্র ধরে “সুস্বাস্থ্যের জন্য শ্রবণশক্তি রক্ষা”— এ শ্লোগানকে সামনে রেখে প্রতি বছর শব্দ সচেতনতা দিবস পালন করা হয়ে থাকে বিশ্বব্যাপী। যাহোক, যে সুমধুর শব্দে মন আনন্দে নেচে ওঠে। আবার এর মাত্রা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন এই একই মনকে মারমুখী হয়ে ঘাতকের পর্যায়ে ঠেলে দেয়। তাই বলতে দ্বিধা নেই যে, শব্দ সুমধুর হলেও অবস্থাভেদে ঘাতকের ভূমিকায়ও রূপ নেয়।
n লেখক: গবেষক ও অর্থনীতিবিদ