জন্মভিটার প্রতি টানই বড় হয়ে উঠলো পাটগ্রামের তরুণী গৃহবধূ লক্ষ্মী রানী বর্মণের কাছে। মা-বাবা বোন-জামাতা সবাই তাকে রেখে জন্মভিটা ছেড়ে গতকাল চল গেছেন। ভারতে নতুন ঠিকানার সন্ধানে। তরুণী লক্ষ্মী রানী স্বামী আর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে জন্মভূমি কিংবা জন্মভিটাকেই আঁকড়ে পড়ে রইলেন। মা-বাবার জন্য বিলাপ করেছেন, অশ্রুপাত করেছেন কিন্তু জন্মভূমির মাটির মায়া ত্যাগ করতে পারেননি। পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলা ও লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার সদ্যবিলুপ্ত ছিটমহল থেকে গতকাল সোমবার মোট ২৭৮ জন স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য ভারতে চলে গেছেন। দেবীগঞ্জ থেকে চলে গেছে ১৪৭ জন এবং পাটগ্রাম থেকে গেছেন ১৩১ জন।
পঞ্চগড় প্রতিনিধি ও দেবীগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, দ্বিতীয় দফায় ভারত গেলেন পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার বিলুপ্ত কোটভাজনী ও বালাপাড়া খাগড়াবাড়ী ছিটের ২৮টি পরিবারের এক নবজাতকসহ ১৪৭ জন সদস্য। এ দু’টি ছিটের ৩১ পরিবারের ১৭৭ জনের ভারতে যাওয়ার কথা থাকলেও প্রস্তুতি না থাকায় ৩০ জন চতুর্থ দফায় ভারতে যাবেন বলে জানিয়েছেন। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় দেবীগঞ্জের গাজোকাটি বাজার মাঠের অস্থায়ী ক্যাম্পে পঞ্চগড়ের এডিএম মোহাম্মদ গোলাম আজম ও দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার শফিকুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনারের প্রথম সেক্রেটারি রমাকান্ত গুপ্তার নিকট ১৪৭ জন ভারতীয় নাগরিকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ তাদের হস্তান্তর করেন। পরে ৪টি মিনিবাস ও ৭ ট্রাকে করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি ডাঙ্গাপাড়া সীমান্তে। সেখানকার আব্দুর রউফ বিদ্যালয় মাঠে ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম শেষ করা হয়। দুপুরে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার শফিকুল ইসলাম ভারতের কুচবিহার জেলার এডিএম আয়শা রানী ও বিএসএফের ডেপুটি কমান্ডার একে ঝাঁর হাতে মালামালসহ তাদের হস্তান্তর করেন। এসময় নীলফামারীর ডোমার উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবিহা সুলতানা, ডোমার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বসুনিয়াসহ গণমাধ্যম কর্মী, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও বিজিবি সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। পরে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের বরণ করে নেয়।
আজ মঙ্গলবার ৩য় দফায় দেবীগঞ্জ উপজেলার বিলুপ্ত দহলা খাগড়াবাড়ী ছিটমহলের ২৯টি পরিবারের এক নবজাতকসহ ১৪৯ জন ভারত যাবেন। তারা গতকালই প্রয়োজনীয় মাল-সামানাসহ দেবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরে স্থাপিত অস্থায়ী ক্যাম্পে উপস্থিত হয়েছেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দগলা খাগড়াবাড়ী ও দইখাতা ছিটমহলের ২৩টি পরিবারের ১০৮ জন সদস্য ভারতে যাবেন।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি ও পাটগ্রাম সংবাদদাতা জানান, গতকাল সকালে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার সদ্য বিলুপ্ত ছিটমহলের ৩০ পরিবারের ১৩০ জন ট্রাভেল পাসধারী বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা জিরো লাইন দিয়ে ভারত চলে গেলেন। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ৪টি বাসে ট্রাভেল পাসধারীদের আর ৮টি ট্রাকে তাদের অস্থাবর মালামাল নিয়ে বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা জিরো লাইনের দিকে রওয়ানা দেয়ার সময় রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে প্রতিবেশিরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্নায় কান্নায় ভাসেন ট্রাভেল পাসধারীরাও।
‘‘জন্মভূমি ছাড়ি যাচ্ছি। ওখানে জন্মভূমির মতো মাতৃছায়া পাবো কি না কে জানে! হে ভগবান! তোমার কাছে প্রণাম করি, তুমি বঙ্গজননী জন্মভূমির সবাইকে ভালো রাখিও।’’পাটগ্রাম উপজেলার বিলুপ্ত বাঁশকাটা ছিটমহলের বর্মণপাড়ার নিকটতম প্রতিবেশীদের উদ্দেশে একথা বলে ষাটোর্ধ্ব উকিল চন্দ্র বর্মণ কান্নায় ভেঙে পড়েন। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন দিয়ে দ্বিতীয় দফায় ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণকারী ১৩১ জন বিলুপ্ত ছিটমহলের অধিবাসী সোমবার চলে গেলেন।
উকিল চন্দ্র বর্মণ জানান, তার চার ছেলে ও ৩ মেয়ে। এক ছেলেকে বাংলাদেশেই বিয়ে দিয়েছেন। আর ৩ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন ভারতের কোচবিহার জেলার ধুবগুড়ি ও নয়ারহাট এলাকায়। তিনি ৪ ছেলে, স্ত্রী ও তার ছেলের স্ত্রীকে নিয়ে যান। মেয়েদের আগেই ভারতে বিয়ে দিয়ে দেন। শিক্ষার্থী সুমন চন্দ্র বর্মণ, ছাত্রী সুচরিতা রাণী বর্মণ, জ্যোত্ন্সা রানী বর্মণ জন্মভূমি ছেড়ে যাওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন। পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রুহুল আমীন বাবুল, উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর কুতুবুল আলম ও সহকারি কমিশনার (ভূমি) টিএমএ মমিন ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণকারীদের বিদায় সংবর্ধনা জানিয়ে মিষ্টি মুখ ও রজনীগন্ধার স্টিক হাতে তুলে দেন।