নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন ও গণমাধ্যম

কিছুদিন আগেও দেশের ৪০শতাংশ মানুষ চরম অভাবে থাকতেন। মৌসুমী দুর্ভিক্ষ এবং কর্মসংস্থানের অভাবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল সরকারের জন্য এক বড় সমস্যা। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানির পর বিদেশ থেকে আমদানি করা ছাড়া বিকল্পও থাকত না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে খাদ্য উত্পাদন বেড়েছে। বেড়েছে চালের উত্পাদন, সবজির উত্পাদন, দুধ, মাংস, ডিমের উত্পাদনও বাড়ছে। ঘাটতি উত্পাদনের সমস্যা অতিক্রম করে দেশ এখন বাড়তি উত্পাদনের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা।

আসলে নিরাপদ খাদ্য বলতে আমরা কী বুঝি? আমার মতে, খাদ্য মানেই সেটা হতে হবে নিরাপদ। সংজ্ঞা অনুযায়ী যা শরীরের পুষ্টি সরবরাহ করে, মগজের বৃদ্ধি ঘটায়, রোগ বালাই প্রতিরোধের শক্তি তৈরি করে সেটাই খাদ্য। যা পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করে না, যা রোগ প্রতিরোধের পরিবর্তে রোগ বালাইয়ের বিস্তার ঘটায় সেটি খাদ্য হতে পারে না। নিশ্চিতভাবেই সেটি অখাদ্য। কিন্তু কোনটি খাদ্য আর কোনটি অখাদ্য এটি নিয়েও নানা বিভ্রান্তি প্রচলিত আছে। কীটনাশক ব্যবহার হলেই যে সেটি অখাদ্য হয়ে গেল সেটি বলা যাবে না।  যদি আদর্শ কৃষি জ্ঞান প্রয়োগ করে কেউ যদি ফসল উত্পাদন করেন তাহলে সেটি নিরাপদ হবেই। কারণ সার প্রয়োগে ফসলের পরিমাণগত বৃদ্ধি ঘটে, পুষ্টি তেমন না বাড়লেও তা স্বাস্থ্যসম্মত নয় সেটা বলা কঠিন। তবে অপরিমিত সার প্রয়োগে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হয়, পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সেটি নিশ্চয়ই কাম্য নয়। কীটনাশক প্রয়োগের ফলে ফসলে বিষাক্ত উপাদানের অবশেষ থেকে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আইপিএম বা আইসিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে সেই ফসল নিরাপদ খাদ্য বলেই চিহ্নিত করা যাবে। আবার মাত্রা অনুসরণ করে পরিণত ফল পাকাতে বৈধ রাসায়নিক ব্যবহার করলেও সেটা অখাদ্য হয়ে যায় না।

আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীরা যে সব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন সেগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করে একদিকে যেমন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব তেমনি পুষ্টি নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যায়। সংকট কেবল জ্ঞানকে সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে। দেশে নিরাপদ খাদ্য উত্পাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারি সিস্টেম নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও উদ্ভাবন করছে নিরাপদ খাদ্য উত্পাদনের প্রযুক্তি। সম্প্রসারণ এজেন্সিগুলোও এ নিয়ে কাজ করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও আইপিএম, আইসিএম এবং সাম্প্রতিককালে আইএফএম প্রযুক্তি অনুসরণ করছে। মানুষও আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়ে উঠছেন।

নিরাপদ খাদ্য উত্পাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের এক বড় ভূমিকা রয়েছে। আজ থেকে ২৫/৩০ বছর আগে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানে ডার্টি ডজনের উপর অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। কীটনাশকের নাশকতা বিষয়ে সেদিন নানা তথ্য তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে ডিডিটি, হেপ্টাক্লোর বিষ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন ছিল। ১২টি ক্ষতিকর কীটনাশকের  বিরুদ্ধে সেদিন যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সেটি ক্রমেই বেগবান হয়েছে। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের সর্বত্র। একই সময়ে যখন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার  একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ধান চাষে আইপিএম প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু হয় তখনও এই  অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দর্শক চিনেছিল বন্ধুপোকা শত্রুপোকা।  ধানক্ষেতে মাছ চাষ এবং পাড়ে সবজি চাষ প্রচার করতে গিয়ে আইপিএম কৌশলকে তুলে ধরা হয়েছে। এসবের ধারাবাহিকতায়  নিরাপদ খাদ্য উত্পাদনের যত কলাকৌশল আছে বিশেষ করে জৈব সার প্রয়োগ, ফেরোমেন ট্রাপ এর ব্যবহার, ট্রাইকোডারমা, উপকারী পোকা উত্পাদনসহ নানা কলাকৌশল অবিরামভাবে প্রচার হয়েছে।

এটাতো ঠিক যে, কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আমাদের জনস্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। যেমন ২০১২ সালে কীটনাশক দেওয়া লিচু খেয়েই দিনাজপুরে ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। পত্রিকায় এই সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরই সাধারণের মধ্যে তৈরি হয় বিশাল এক আতঙ্ক। প্রশাসনও নড়ে চড়ে বসেন। আমেরিকার মেডিক্যাল জার্নাল ও  আইসিডিডিআরবির গবেষণায়ও এটা প্রমাণিত হয়। ১৩  শিশুর মৃত্যুর ঘটনা আমাদের আরো সচেতন করে। সে সময় আম গাছে হরমোন প্রয়োগ, কার্বাইড দিয়ে আম পাকানো, কলা পাকানো, তরমুজে রং প্রয়োগ, গরু মোটাতাজা করতে স্টেরয়েড, মত্স্য খাদ্যে বিষাক্ত প্রোটিন প্রয়োগসহ নানা বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হতে থাকে। এর ফলে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

প্রচারমাধ্যমের বদৌলতে সচেতনতা যেমন বাড়ে আবার নেতিবাচক ঘটনাও ঘটতে থাকে। অতিউত্সাহী প্রশাসন ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্র দিয়ে আমের ফরমালিন পরীক্ষা করতে গিয়ে নষ্ট করে হাজার হাজার টন আম। ২০১৬, ২০১৭ সালে এই ঘটনা সৃষ্টি করে চরম আতঙ্ক। আসলে আমে যে ফরমালিন প্রয়োগ করা হয় না- সেটি না জেনেই নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। পরে দেখা যায়, বিষয়টি ছিল একেবারেই অবৈজ্ঞানিক এবং এর ফলে আম চাষি ও বিক্রেতারা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একইভাবে দেশের সম্পদও বিনষ্ট হয়েছে। আর সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়েছে আম থেকে। বিজ্ঞানীরা বার বার বলার চেষ্টা করেও তেমন লাভ হয় নি। প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং কৃষি বিজ্ঞানীদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও বেশ প্রকট ছিল।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হওয়ার পর থেকে এ বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হলেও জ্ঞানের পার্থক্য এখনো দূর  করা যায়নি। প্রতিটি সংস্থা নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে  এ বিষয়ে কাজ করছেন। গণমাধ্যম এক্ষেত্রে অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছে। সাংবাদিকসমাজ তো নিজেরাও মানববন্ধন সহ নানা সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করে। ২০১৫-১৬ সালে যখন আম ধ্বংসের মহাযজ্ঞ পরিচালনা করা হয় তখন সাংবাদিকরা নানা তথ্য উপাত্ত দিয়ে প্রশাসনকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন। তবে একথাও ঠিক, গণমাধ্যমও সব সময় সঠিক তথ্য প্রচার করতে পারেনি। আসলে আমে যে কখনোই ফরমালিন ব্যবহার করা হয় না এমন কথা এখনো অনেকে বিশ্বাস করেন না। অপপ্রচারের ফলে অনেক খাদ্য অখাদ্য হয়ে গেছে আমাদের কাছে। কৃষি ফসলে অতিমাত্রায় কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ে যেমন সঠিক জ্ঞান কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা উচিত তেমনি গণমাধ্যম কর্মীদেরও কীটনাশকের সঠিক মাত্রা সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা উচিত। তাছাড়া রাজধানীর সাংবাদিকরা যতটা সচেতন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের গণমাধ্যম কর্মীরা ততটা সচেতন নন। তাদেরকেও তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ে হালনাগাদ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করতে পারেন।

n লেখক :উপস্থাপক, মাটি ও মানুষ, অধ্যাপক, সাভার কলেজ