বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। প্রতিবছর ১.৩৭% হারে এ দেশের জনসংখ্যা বেড়ে চলছে। আয়তনে অনেক ক্ষুদ্র হলেও জনসংখ্যার ভারে ভারাক্রান্ত বাংলাদেশ। বাংলাদেশ আজ যে কয়েকটি সমস্যায় জর্জরিত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো বেকারত্ব। আমাদের দেশের কর্মবাজারে প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ তরুণ প্রবেশ করছে। এত তরুণের চাকরির ব্যবস্থা করা একটু কঠিন বটে। তাই তো প্রতিবছর চাকরি না পেয়ে হাহাকার করে হাজারও তরুণ। অনিশ্চয়তায় দিন কাটে তাদের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি পরিবারের। কিন্তু আমরা কি আমাদের বেকারত্বের জন্য শুধু উচ্চহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকেই দায়ী করব। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে চাকরি প্রত্যাশীর সংখ্যা বেশি হওয়াই বেকারত্বের কারণ। আসলেই কি তাই? আমারা কি চেষ্টা করলে আমাদের এই প্রতিটি বেকার তরুণকে দক্ষ ও যোগ্য মানব সম্পদে পরিণত করতে পারতাম না? আমাদের একটু ভিন্নধর্মী ভাবনা কি পারত না তাদের জীবন বদলে দিতে? আমি বলব অবশ্যই এটা সম্ভব। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই পারে আমাদের জীবন বদলে দিতে।
আসলে আমরা সকলেই একটি চাকরির প্রত্যাশা করি। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ছেলে-মেয়ের প্রত্যাশা থাকে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ার। ভালো বেতন, সামাজিক সম্মান ইত্যাদি কারণে তারা এই চাকরিটি পেতে ইচ্ছুক এবং সেই লক্ষ্যে তারা অনার্সের প্রথম থেকেই পড়াশুনা শুরু করে দেয়। এর ফলস্বরূপ অনেক ছাত্রই একাডেমিক পরীক্ষায় তার সামর্থ্য অনুযায়ী ফলাফল করতে পারে না। এতে করে শুধু সে নিজেই না দেশও অনেক বড় ক্ষতির শিকার হয়। কারণ ঐ ছেলে/ মেয়ে যদি বিসিএস-এর জন্য তার একাডেমিক পড়ায় কম মনোযোগী না হয়ে বরং ঐ সময়টুকু তার একাডেমিক পড়ার জন্য ব্যয় করত তাহলে সে তার একাডেমিক ফলাফল আরও ভালো করতে পারত। সে তার অধ্যয়নের বিষয়টিতে আরও পারদর্শী হয়ে উঠত। পরবর্তীকালে সে তার বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো চাকরিতে যোগদান করে তার অর্জিত জ্ঞান এবং মেধা দিয়ে দেশের উন্নতিতে অবদান রাখতে পারত। কিন্তু আমাদের দেশে হচ্ছে এর ঠিক উল্টো। যে চিকিত্সাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করে আর যে প্রকৌশলে পড়াশুনা করে দেখা যায় পড়াশুনার বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা হলেও চাকরির ক্ষেত্রে তাদের একই ধরনের চাকরি পছন্দ এবং সেই পেশা তাদের পঠিত বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য নয়। আর এই একটি নির্দিষ্ট পেশা/চাকরির প্রতি সবার আগ্রহই বেকারত্বের মূল কারণ।
বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হলে যে দেশের উন্নতিতে অবদান রাখা যাবে না সে কথা আমি বলছি না। বরং এখানে সত্, মেধাবী, কর্তব্যপরায়ণ এবং যোগ্য তরুণের দরকার আছে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন যখন দেশের বেশির ভাগ তরুণ তাদের নিজেদের ক্ষেত্র ছেড়ে বিসিএস-এর জোয়ারে গা ভাসায়। প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ মেধাবীরা বিসিএস পরীক্ষা দেয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদের একটি বড় অংশ চাকরি পায় না। ফলশ্রুতিতে তারা হতাশ হয়ে পড়ে। আর একজন বেকার হতাশ যুবকের পক্ষে তার কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সৃষ্টিশীল কিছু করা একটু কঠিন বটে। এভাবেই আমাদের প্রজন্মের একটি বড় অংশ শুধু বিসিএস-এর পিছনে ছুটে তাদের ভিতরে যে অযুত সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে সেটি খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়। আসলে এর পিছনে আমাদের সমাজ ব্যবস্থাই দায়ী।
পাশাপাশি আমাদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়া বা ভিন্নধর্মী কিছু করার প্রবণতাও খুব কম। কিন্তু উন্নত দেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে সেখানে তরুণরা প্রচুর পরিমাণে গবেষণা এবং উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত। তারা মেধা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে তাদের দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এতে করে তারা নিজেরা যেমন বেকার থাকছে না তেমনি দেশও পাচ্ছে একটি স্বনির্ভর জনগোষ্ঠি। একটি দেশের অর্থনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য এর থেকে ভালো উপায় আর কিছু হতে পারে না। আমাদের দেশের তরুণরাও যদি শুধুমাত্র চাকরিকেই তাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য না করে এভাবে তাদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে সৃষ্টিশীল কাজে মেতে উঠে তা হলে বাংলাদেশ আর পিছিয়ে থাকবে না। তরুণরাও মুক্তি পাবে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে। বিভিন্ন আবিষ্কার আর নতুন নতুন গবেষণায় বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোর সঙ্গে একই মঞ্চে উঠবে বাংলাদেশ। তাই পরিবর্তন হোক দৃষ্টিভঙ্গির। আমাদের তরুণদের হাত ধরে শুরু হোক সেই সোনালি সময়। সময় এখন শুধুই বেকারমুক্ত স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার।
n লেখক : শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ধ