পাকিস্তানের কাছ থেকে পাওনা ও যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায়ে উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। একাত্তরে মুক্তিকামী বাঙালির ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকারী দেশটির সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্নেরও দাবি করেছে যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আন্দোলনরত এই মোর্চা।
বুধবার শাহবাগে প্রজন্ম চত্বরে এক সমাবেশে মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার এই দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক দেশই ভাগ হওয়ার সময় সম্পদও ভাগাভাগি করেছে। তাই সরকারের কাছে দাবি জানাব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ শুধু নয়, এই পাকিস্তানের কাছে আমাদের যে পাওনা রয়েছে, যে বকেয়া রয়েছে তাও ফেরত আনার জন্য সব ধরনের আর্ত্েজাতিক প্রক্রিয়া শুরু করা হোক।
১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে উভয় দেশই দেনা-পাওনার বিষয়গুলো পরীক্ষা করে দেখবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ বহুবার তাগাদা দিলেও পাকিস্তান বৈঠকে বসতে অনীহা দেখিয়েছে বলে ২০১১ সালে সংসদকে জানিয়েছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি।
মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানের কাছ থেকে ন্যায্য হিস্যা আদায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা 'বেগবান' হয় বলেও সে সময় দাবি করেছিলেন তিনি। পাকিস্তান সাড়া না দিলেও সরকার সম্ভাব্য সব উপায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখবে বলে চার বছর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে বক্তব্য এলেও এ বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতির কথা জানা যায়নি।
যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মো. মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাকে ঘিরে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়ার সমুচিত জবাব দেওয়া হয়নি বলে মনে করেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র। তিনি বলেন, ‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, সরকার পাকিস্তানের ব্যাপারে কেন এতো নমনীয় ভাব দেখাচ্ছেন? সরকার ধাপে ধাপে পাকিস্তানের প্রশ্নে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছেন না কেন?’
‘আমি সরকারের কাছে আহ্বান জানাব- আপনারা পাকিস্তানের প্রশ্নে এবং জঙ্গিবাদের প্রশ্নে কোনো আপোষ করবেন না। পাকিস্তান ও জঙ্গিবাদের প্রশ্নে নমনীয়তা পরিহার করে এই জাতিকে নিরাপদে বাঁচার সুযোগ তৈরি করে দিন’। ‘একইসাথে আহ্বান জানাচ্ছি, পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ, বন্ধ ও স্থগিতের দাবি এসেছে মানুষের মধ্য থেকে; সেই দাবি পূরণ করে আপনারা জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা সেটির প্রতিফলন দেখান’।
ইমরান এইচ সরকার বলেন, ‘পাকিস্তানি হানাদার, যারা একাত্তরে ৩০ লা্খ মানুষকে হত্যা করেছে তারা পাগলের মতো প্রলাপ বকতে শুরু করেছে। যখন একের পর এক যুদ্ধাপরাধীদের রায় কার্যকর করা হচ্ছে তখন পাকিস্তানিরা এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে, তারা বিচার ব্যবস্থাকে খাটো করা চেষ্টা করে যাচ্ছে’। নিজেরাও যুদ্ধাপরাধের বিচারের মুখোমুখি হওয়ার শঙ্কা থেকেই পাকিস্তান একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যার দায় অস্বীকার করছে বলে মনে করেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র।
‘বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল যখন পাকিস্তানের দোসরদের বিচার করছে তখন তারা এই বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। তারা জানে যে, এদের বিচার শেষ হলে পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদেরও বিচারের দাবি আসতে পারে’। ইমরান বলেন, পাকিস্তান সরকার ১৯৭২ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্তে হামিদুর রহমান কমিশন গঠন করেছিল। ‘সেই কমিশনের রিপোর্টেই বাংলাদেশে সংঘটিত পাকিস্তান আর্মির ব্যাপক গণহত্যার কথা উল্লেখ রয়েছে’।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার যদি পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্থগিত না করে তাহলে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের বিবৃতির প্রেক্ষিতে দেশের জনগণ যেভাবে রাজপথে নেমেছিল, পাকিস্তানের দূতাবাস ঘোরাও করেছিল, আবারও তাই করা হবে’।
বিকালে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন ইমরান। সমাবেশ শেষে শাহবাগ থেকে একটি মশাল মিছিল বের করেন গণজাগরণ কর্মীরা। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ঘুরে শাহবাগে ফিরে শেষ হয়।