শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ভূমি অধিকারের ক্ষেত্রে বঞ্চনা ও হয়রানির শিকার সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিতরা। তারা বিদ্যালয়ে ভর্তি, নিজস্ব ভাষা ও নিজ ধর্ম শিক্ষা বিষয়ে পাঠগ্রহণে বাধার সম্মুখীন হয়। অস্পৃশ্যতা’র চর্চা থেকে রোগীকে স্পর্শ না করে ও ‘চেক-আপ’ না করেই ওষুধ লিখে দেওয়া, তুচ্ছজ্ঞান করে হাসপাতালের প্রাপ্য নানা সেবা ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভূমি অধিকারের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ও উন্নয়নের নামে বনভূমিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার খর্ব করা হয়। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ক্ষেত্রেও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিতরা বৈষম্যের শিকার হয়। ধর্মীয় উত্সবের সময় সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম থেকে তাদের সহায়তা দেওয়া হয় না। প্রকৃতপক্ষ মূলধারার জনগোষ্ঠীর চেয়ে সব ক্ষেত্রে তারা ব্যাপক বৈষম্য ও দুর্নীতির শিকার হচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবি’র এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
‘বাংলাদেশের আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠী: অধিকার ও সেবায় অন্তর্ভুক্তির চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়’ গবেষণা প্রতিবেদনটি গতকাল রবিবার টিআইবি’র ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিতদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে খসড়া বৈষম্য বিলোপ আইন কার্যকর করাসহ ১৩ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার আবু সাঈদ মো. জুয়েল মিয়া।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ইতিবাচক অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশে আদিবাসী ও দলিতদের অধিকার ও সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বঞ্চনা, অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হওয়ার চিত্রটি বেশ প্রকট। এ ক্ষেত্রে আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোতেও দুর্বলতা রয়েছে। কারণ সংবিধানে একদিকে বলা হয়েছে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার। অন্যদিকে আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক কোনো স্বীকৃতি আমরা দেখি না। এমনকি আদিবাসী শব্দটি ব্যবহারেও প্রশাসনিক বিধি-নিষেধ প্রদান করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আদিবাসী ও দলিতদের পেছনে রেখে অর্ন্তভুক্তিমূলক উন্নয়ন অসম্ভব। একইভাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনও অসম্ভব। তাই সংবিধানে আদিবাসী ও দলিতদের স্বতন্ত্র ও আলাদা পরিচয় নিশ্চিত করতেই হবে।’
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিতদের অধিকার নিশ্চিতে টিআইবি’র করা ১৩ দফা সুপারিশে আরো রয়েছে, খসড়া বৈষম্য বিলোপ আইন চূড়ান্ত করে এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, সকল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং অবাঙালি দলিত শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের অধিকার নিশ্চিত করতে তাদের মাতৃভাষায় পাঠ্যবই প্রণয়ন ও পাঠদানের জন্য শিক্ষক নিয়োগ করা, সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভূমি সমস্যা সমাধানে পৃথক ভূমি কমিশন গঠন এবং তাদের জমির মালিকানা সমস্যার কার্যকর নিষ্পত্তি করা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিতদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও মর্যাদার উন্নয়নে তাদের মতামতের ভিত্তিতে সামাজিক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা।