খুঁড়িয়ে চলছে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল। একসময়ের ৮০ শয্যার হাসপাতালটি ক্রমান্বয়ে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। কিন্তু আধুনিকায়নের কার্যক্রম বাস্তবায়নে চলছে ধীরগতি। অবকাঠামোগত সুবিধা ও নতুন অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী চিকিত্সকসহ জনবলের পদ সৃষ্ট না হওয়ায় রোগীরা পর্যাপ্ত চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতালটি নগরীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হলেও নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। চিকিত্সা সেবার পরিধি বাড়লেও সুবিধা এখনো সীমিত। বিরাজমান সমস্যা নিয়ে অনেক লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু সাড়া মিলছে না।
নামেই ২৫০ শয্যার হাসপাতাল। শিশু ও গাইনী ছাড়া বাকী ওয়ার্ডগুলোর বেশিরভাগ বেড খালি। দীর্ঘ কয়েক বছরেও ২৫০ শয্যা অনুপাতে অবকাঠামোসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি না হওয়ায় সংশ্লিষ্টরা এটাকে বোঝা মনে করছেন। প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে চিঠি লিখতে লিখতে হতাশ কর্তৃপক্ষ।
১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত ৮০ শয্যার হাসপাতালটি পরবর্তীতে ১৫০ শয্যায় এবং বর্তমানে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। বর্তমানে চিকিত্সাসেবা চালু থাকা বিষয়ের মধ্যে রয়েছে নাক-কান-গলা, মেডিসিন, সার্জারী, অর্থোপেডিকস, চক্ষু, শিশু ও স্ত্রী রোগ ও প্রসূতি বিভাগ। কিন্তু নতুন বিভাগ চালু করার জন্য অন্তত ১০০ শয্যার উপযোগী একটি নতুন ভবন নির্মাণ প্রয়োজন। এই নিয়ে ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনেক লেখালেখি হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ২৫০ শয্যার হাসপাতালের নতুন অর্গানোগ্রাম অনুসারে চিকিত্সক ও জনবলের ২৬২টি পদ সৃজন করতে প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এসব জনবলের মধ্যে রয়েছে চিকিত্সক, সার্জন, এ্যানেসথেসিস্ট, স্টাফ নার্স, টেকনোলজিস্ট ও অফিস সহকারী। বর্তমানে ১৫০ শয্যার জনবলের কাঠামো দিয়ে চিকিত্সা সেবা পরিচালিত হচ্ছে। তার মধ্যেও চিকিত্সকের ৪টি, নার্সদের ২২টি ও ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদে ৫টি পদ শূন্য রয়েছে।
২৫০ শয্যায় উন্নীত করার পর কয়েকটি নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— কার্ডিওলজি, নেফ্রোলজি, হেপাটোলজি ও ইউরোলজি। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় নেফ্রোলজি হেপাটোলজি ও ইউরোলজি রোগীদের একই কক্ষে রেখে চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। শিশু ও প্রসূতি ওয়ার্ডে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। সার্জারি বিভাগের অপারেশন থিয়েটারে ৩টি ওটি টেবিল রয়েছে। ওটি টেবিলগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। টেবিলের লাইট নষ্ট। অপারেশন থিয়েটারে সার্বক্ষণিক বিদ্যুত্ সুবিধা না থাকায় অপারেশন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
৮০ শয্যার পুরাতন ভবনে মূলত ২৫০ শয্যার চিকিত্সা সেবা চলছে। এতে চিকিত্সা সেবার মান উন্নতকরণ, রোগী ভর্তি নিয়ে সংকট, হাসপাতালের পরিবেশ ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা দুরূহ হয়ে পড়েছে। অতি পুরাতন ভবনের দেওয়াল চুষে পানি পড়ছে। দরজা-জানালা ভাঙ্গা, পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক বাতি নেই। হাসপাতালের টয়লেট, ময়লার টাংকি, মেনহোল জরাজীর্ণ। ওয়ার্ডগুলোতে অধিকাংশ বৈদ্যুতিক পাখা নষ্ট। সংশ্লিষ্টরা জানান, চিকিত্সা সরঞ্জাম, আসবাবপত্র, অবকাঠামো মেরামত কার্যক্রমে প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রতায় রোগীদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে।
এমআরআই মেশিন ১টি, ইকোগ্রাম ১টি ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন ১টি। ইজিসি ও এক্স-রে মেশিনের অপ্রতুলতা রয়েছে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের ফিজিওথেরাপি প্রদানের জন্য ফিজিওথেরাপিস্ট পদ সৃজন করা হয়নি।
হাসপাতালের চিকিত্সক ও জনবলের কোনো আবাসিক সুবিধা নেই। এতে চিকিত্সাধীন রোগীরা প্রয়োজনীয় মুহূর্তে জরুরি সেবা পাচ্ছে না। সকাল থেকে বিকাল ২টা পর্যন্ত অভিজ্ঞ চিকিত্সকদের পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে নীরবতা নেমে আসে। রাতের বেলায় কর্তব্যরত জুনিয়র চিকিত্সকরা সেবা দিয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. সরফরাজ খান চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, অবকাঠামোগত ও চিকিত্সা সেবার সাথে সংশ্লিষ্ট জনবলের স্বল্পতায় সুফল পাচ্ছেন না রোগীরা। চট্টগ্রামে একটি নতুন মেডিক্যাল কলেজ ও ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালকে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আধুনিকায়ন করা হলে চমেক হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক কমে যাবে।’