আমদানির অর্থ পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ বাড়ছে

আমদানির জন্য ব্যবসায়ীদের স্বল্প সুদে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ (বায়ার্স ক্রেডিট) নেওয়ার হার ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ব্যবসার খরচ কমানোর জন্য শিল্পোদ্যোক্তারা বায়ার্স ক্রেডিটের দিকে ঝুঁকছেন। বায়ার্স ক্রেডিটের মাধ্যমে আমদানি হওয়া পণ্য উত্পাদনশীল খাত বা রপ্তানি সহায়ক খাতে ব্যবহূত হলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য ভাল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিক্রেতাদের কাছ থেকে আগে বাকিতে পণ্য কিনতেন এ দেশের আমদানিকারকরা। এতে আমদানিকারকরা পণ্যের দর-দাম করার সুযোগ পেতেন না। ২০১২ সালের পর থেকে পণ্য আমদানিতে ব্যাংক থেকে বায়ার্স ক্রেডিট নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন আমদানিকারকরা। এরপর থেকে এই ঋণ গ্রহণের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বায়ার্স ক্রেডিটের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৮৬ লাখ ৭১০ কোটি টাকা। অর্থাত্ গত এক বছরে এর পরিমাণ ৩১ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা বা ৩৬ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আগে কখনো এত বেশি বায়ার্স ক্রেডিট নেওয়া হয়নি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে আমদানি (ইপিজেড বাদে) খরচের ২৭ শতাংশ বায়ার্স ক্রেডিট দিয়ে মেটানো হয়েছে।

বায়ার্স ক্রেডিট হচ্ছে দেশের আমদানিকারকের বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া ঋণ। এই ব্যবস্থায় দেশের আমদানিকারক মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতে স্থানীয় ব্যাংকের গ্যারান্টি সাপেক্ষে বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে পারেন। এক্ষেত্রে সুদহার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ। এ ধরণের কোনো ঋণের সুদহার ৬ শতাংশের বেশি হলে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয় ব্যাংকগুলোর। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এসব ঋণের মেয়াদ এক বছর, আর শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে মেয়াদ ৬ মাস। এ কারণে ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই ঋণ শোধ হতে থাকে। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপন জারি করে ব্যবসায়ীদের এই ঋণ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। পরের মাস থেকেই শুরু হয় এই ঋণ গ্রহণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদেশের ব্যাংকগুলোতে ঋণের সুদহার অনেক কম। সেক্ষেত্রে ৪ থেকে ৫ শতাংশ সুদের নিচেও বায়ার্স ক্রেডিট নিতে পারছেন আমদানিকারকরা। তবে বড়-বড় দেশি কয়েকটি ব্যাংকও বায়ার্স ক্রেডিট দিচ্ছে। যদিও পরিমাণ তা খুব সামান্য। আমদানিকারদের বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ পাওয়ার সুযোগ পণ্যমূল্য নির্ধারণে নেগোশিয়েট করার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে দেশি আমদানিকারকদের খরচ কমছে। আগে বিক্রেতাদের কাছ থেকে বাকি করে পণ্য কেনা হতো। এ জন্য বিক্রেতাদের নির্ধারিত দামেই পণ্য কিনতে বাধ্য ছিলেন আমদানিকারকরা। অনেকটা সাশ্রয়ী বলে বায়ার্স ক্রেডিট দিনদিন জনপ্রিয় হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে ব্যাংক খাতে তারল্য সঙ্কট চলছে। ফলে ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারছে না। আবার স্থানীয় ঋণে সুদ হারও অনেক বেশি। ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি’র পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামানো সম্ভব হচ্ছে না। শিল্প খাতের ঋণের সুদহার কিছুটা কমলেও স্বল্পমেয়াদী ঋণে সুদ অনেক বেশি।

আমাদানিকারকরা বলছেন, পণ্য আমদানিতে দেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তার সুদ অনেক বেশি। কিন্তু বিদেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে সুদহার দেশভেদে ৩ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে। এতে বায়ার্স ক্রেডিট ব্যবসার খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। তবে এক ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবীদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, বায়ার্স ক্রেডিটের মাধ্যমে আমদানি হওয়া পণ্য যদি উত্পাদনশীল ও রপ্তানি সহায়ক খাতে ব্যবহার হয় তাহলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য ভাল। তবে ওইসব আমদানি পণ্য যদি অন্য খাতে ব্যবহার হয় এবং ঋণের মেয়াদ যদি কম হয় তাহলে তা বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে চাপ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। এখন প্রচুর শিল্প কাঁচামাল এবং শিল্প মেশিনারিজ আমদানি হচ্ছে। এসব আমদানির জন্য বায়ার্স ক্রেডিট আমদানিকারকদের জন্য সুবিধা দিচ্ছে।