মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রাথমিক, নিম্ন-মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরের নিষিদ্ধ নোট-গাইড বইসহ নিম্নমানের বাংলা ও ইংরেজি গ্রামার বই অবাধে বিক্রি হচ্ছে। বছরের শুরু থেকেই উপজেলার বইয়ের দোকানগুলোতে চলছে এসব নিম্নমানের বইয়ের রমরমা ব্যবসা। এতে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, পুস্তক বিক্রেতা ও শিক্ষক সমিতির অসাধু নেতাদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিঃ সহ একাধিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে তাদের বই বিক্রিতে সহায়তা করে। উপজেলা সমিতির আওতায় থাকা মাধ্যমিক ২২টি, জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয় ৬টি, মাদরাসা পর্যায়ের ৩টি বিদ্যালয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য এই সব বই কেনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকের পছন্দের বাইরে অন্য কোনো প্রকাশনীর বই কিনছে না। সেইসব বইয়ের মান খারাপ হলেও অভিভাবকরা অনেকটা বাধ্য হয়েই বইগুলো সন্তানদের কিনে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
উপজেলা সদরের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে বই কিনতে আসা অভিভাবক নাজমুল হক স্বপন, সালাহ উদ্দিন, আবুল কালাম বেপারিসহ অনেকেই বলেন, শিক্ষকদের নির্দেশের বাইরে বই নিয়ে গেলে সন্তানরা সেই বই গ্রহণ করছে না। অথচ এই সব বইয়ের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে রয়েছে প্রচুর ভুল সেই সঙ্গে লেখার মানও ততটা উন্নত নয়। নিতান্ত বাধ্য হয়েই শিক্ষকদের বলে দেওয়া এসব নিম্নমানের বই সন্তানদের কিনে দিচ্ছি আমরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষক সমিতির এক সদস্য জানান, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিঃ প্রকাশনীসহ একাধিক নিম্নমানের বই প্রকাশনীর সঙ্গে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে যোগসাজশ করে সমিতির আওতায় থাকা ৩১টি মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে এসব বই কেনার জন্য বাধ্যতামূলক নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। আর এ সুযোগে বইয়ের দোকানগুলো নিম্নমানের বই বিক্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ।
জানা গেছে, পাঞ্জেরী প্রকাশনীর প্রতিটি গাইডের দাম ৬ষ্ঠ শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বই ৩৭৪ টাকা, সলিউশন ৮৮ টাকা, ইংরেজী ৪৪০ টাকা, ৭ম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বই ৩৭৪ টাকা, সলিউশন ৮৮ টাকা, ইংরেজী গ্রামার বই ৪৬২ টাকা, ৮ম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ ৪২৭ টাকা, সলিউশন ১১০ টাকা, ইংরেজী গ্রামার ৫৩৯ টাকা, ৯ম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ ৫৭২ টাকা, সলিউশন ১৩২ টাকা, ইংরেজী গ্রামার বই ৫৪৯ টাকা। অন্যান্য প্রকাশনীর গাইড বইয়ের দাম ৩শ থেকে ৪শ টাকা। বাংলা এবং ইংরেজী গ্রামার বইয়ের দাম একত্রে ১২ শ টাকার উপরে।
প্রকাশকের কাছ থেকে প্রাপ্ত ডোনেশনের টাকা স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীর উপর নির্ভর করে। শুধু ডোনেশন নয়, বিভিন্ন স্কুলের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফ্রি ছাপিয়ে দেওয়ার চুক্তিও করে প্রকাশকরা। বাজারের একজন বই বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্থানীয় এক শ্রেণির অসাধু শিক্ষক অনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যবহার করে কোম্পানীগুলোর কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা নিচ্ছে। শিক্ষক নামধারী কিছু লোক তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার চক্রান্ত করছে। কতিপয় শিক্ষক নেতা ছেলেমেয়েদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে উল্লেখ করে কয়েকজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
উল্লেখ্য, সরকার প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের নোট ও গাইড বই মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশনা, আমদানি, বিতরণ ও বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে (সূত্র: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড)। উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বালিয়াখোড়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ ফারুক মিয়া বলেন, পাঞ্জেরী প্রকাশিত বই সহজ মনে হয়েছে। তাই পাঞ্জেরীর বই সবাইকে কিনতে বলেছি এবং পাঠ্য তালিকায় দিয়েছি। তিনি পাঞ্জেরীর কাছ থেকে শিক্ষক সমিতির আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।
উপজেলার সচেতন মহল নিম্নমানের ভুলে ভরা গাইড ও ব্যাকরণ বই পড়া থেকে শিক্ষার্থীদের বিরত রাখতে ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে এই অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের জোরালো হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মৌসুমী সরকার রাখী বলেন, প্রকাশকদের কাছ থেকে শিক্ষক সমিতির আর্থিক সুবিধা লাভের বিষয়টি সত্য হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।