আইন মেনে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করছেন না রিটার্নিং অফিসাররা। এজন্য বেশ কয়েকজন রিটার্নিং অফিসারের কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর মধ্যে একজন রিটার্নিং অফিসারের (জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা) বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করেছেন দুইজন নির্বাচন কমিশনার। যেসব এলাকায় মন্ত্রী-এমপিরা আচরণবিধি ভঙ্গ করছেন, সেই এলাকার রিটার্নিং অফিসাদের কাছে কৈফিয়ত চেয়ে চিঠি দিয়েছে কমিশন। এছাড়াও তিন জায়গায় একটি রাজনৈতিক দলের একাধিক প্রার্থী থাকলেও কেন-অন্যদের মনোনয়ন গ্রহণ করা হয়েছে, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। এমপিদের নির্বাচনী প্রচারণা ঠেকাতে স্পিকারের কাছে চিঠি দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিবালয়ের সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘যেসব এলাকায় আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা ঘটছে, সেখানে কি ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে তা জানতে চেয়ে রিটার্নিং অফিসারদের চিঠি দেয়া হচ্ছে। ফুলপুরে দুই মন্ত্রীর বিষয়ে রিটার্নিং অফিসারের গৃহিত ব্যবস্থা জানতে গতকাল বৃহস্পতিবার চিঠি দেয়া হয়েছে।
ইসি সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, অনিয়মের অভিযোগে সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভার রিটার্নিং অফিসার আবুল হোসেনকে প্রত্যাহার করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করেছেন দু’জন নির্বাচন কমিশনার। রিটার্নিং অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম লাল্টু উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যান পদ থেকে যথাযথভাবে পদত্যাগ না করলেও তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছেন। তবে লাল্টু ইত্তেফাককে বলেন, তিনি ২ ডিসেম্বর দলীয় মনোনয়ন পেয়ে ৩ ডিসেম্বর সকালে জেলা প্রশাসকের কাছে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রের গৃহীত কপিও আছে। এখানে কোন অনিয়ম হয়নি। গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে ময়মনসিংহের ফুলপুর পৌর শহরে এক পথসভায় বক্তব্য রাখেন দু’জন মন্ত্রী। কিন্তু নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করে ওই পথসভা করলেও কেন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি তা জানতে গতকাল রিটার্নিং অফিসারকে (উপজেলা নির্বাহী অফিসার) চিঠি দেয়া হয়। ইসি সচিবালয়ের উপ-সচিব রকিব উদ্দীন মণ্ডলের পাঠানোর নির্দেশনায় ‘আচরণবিধি ভঙ্গের জন্য দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। একইসঙ্গে গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত করতেও রিটার্নিং কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নির্দেশনায় গত ৭ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ফুলপুর পৌরসভায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে অবহিত করতে বলেছে নির্বাচন কমিশন।
শরীয়তপুর সদর পৌরসভায় আওয়ামী লীগ থেকে দু’জনকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এর মধ্যে ২ ডিসেম্বর প্রথমে মনোনয়ন পান রফিক কোতয়াল। কিন্তু ঋণখেলাপির কারণে তার মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী ফারুক তালুকদারকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়। সেই দলীয় মনোনয়ন গ্রহণ করেন রিটার্নিং অফিসার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক)। এ ঘটনায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন একাধিক নির্বাচন কমিশনার। পরে কমিশনের নির্দেশে ফারুক তালুকদারের দলীয় মনোনয়ন বাতিল করা হয়। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী ইত্তেফাককে বলেন, ‘আইনানুযায়ী কোন নিবন্ধিত দল থেকে একাধিক দলীয় মনোনয়ন দেয়া যায় না। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পরে এ ধরনের কোন সুযোগ রাখা হয়নি। এ কারণে দ্বিতীয়বার দলীয় মনোনয়ন গ্রহণ করা হয়নি।
এছাড়াও খুলনার পাইকগাছা, মাগুরা সদর ও বরগুনার বেতাগী পৌরসভায় আওয়ামী লীগের দু’জন করে প্রার্থী আছে বলে রিটার্নিং অফিসাররা নির্বাচন কমিশনে প্রতিবেদন পাঠান। এ ঘটনায় বিরক্ত হয় কমিশনের সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, আইনে স্পষ্ট বলা আছে একজনের বেশি কাউকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া যাবে না, সেখানে ওই তিন পৌরসভার রিটার্নিং অফিসাররা কিভাবে অন্যদের মনোনয়ন গ্রহণ করলেন তা বোধগম্য নয়। এর মধ্যে খুলনার পাইকগাছায় রিটার্নিং অফিসার জেলা নির্বাচন অফিসার, মাগুরায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও বেতাগীতে জেলা নির্বাচন অফিসার।
ইসির সংশ্লিষ্টরা বলেন, ফেনী সদর ও পরশুরাম, চাঁদপুরের উত্তর মতলবের ছেংগারচর, নাটোর সদর, গুরুদাসপুর, ফরিদপুরের বোয়ালমারি, শরীয়তপুর ভেদরগঞ্জের রিটার্নিং অফিসারদের কাজে নিয়ে সন্তুষ্ট নয় ইসি। এসব এলাকার রিটার্নিং অফিসাররা যথাযথভাবে আইন অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করেনি বলে মনে করছেন একাধিক নির্বাচন কমিশনার। তারা বলছেন, আইনে রিটার্নিং অফিসারদের ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হলেও তারা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। রিটার্নিং অফিসাররা নির্বাচনে কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গত ২৪ নভেম্বর ঘোষিত ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বপালন করবেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ৪০ জন, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ৬১ জন ও ১৩৩ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। প্রশাসনের কর্মকর্তারা রিটার্নিং অফিসার হিসাবে বেশি থাকায় বরাবরের মতো এবারও ইসির নির্দেশনা সঠিকভাবে পালন করছেন না তারা।
সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি
পৌরসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হোসেন খানকে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশনের সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম। গতকাল নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় শাখা থেকে এ চিঠি পাঠানো হয়।