ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তায় আনসার-ভিডিপি

পৌরসভা নির্বাচনে মূলত আনসার-ভিডিপির হাতে থাকছে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের দায়িত্ব। সাধারণ কেন্দ্র প্রতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর যে ১৯ জন সদস্য থাকবে তার মধ্যে আনসার-ভিডিপির সদস্যই ১৪ জন। পুলিশ থাকবে নামেমাত্র। গত পৌর ও উপজেলা নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করলেও এবার তার প্রয়োজন বোধ করছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
 
তবে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে বিজিবি, র্যাব, এপিবিএন, কোস্টগার্ড ও পুলিশ সদস্যরা থাকবে।  ভোটের নিরাপত্তায় ইসি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের যে কার্যপত্র তৈরি করেছে তাতে এ বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে। এই কার্যপত্র নিয়ে কাল শনিবার রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকে বসবে কমিশন।
 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এই সংখ্যা ভোটকেন্দ্র ও ভোটারের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। গত উপজেলা নির্বাচনে এটি প্রমাণিত হয়েছে। ১৯ জন নিরাপত্তা সদস্যের ১২ জনের হাতে কোনো অস্ত্র থাকবে না। ফলে অপ্রতুল নিরস্ত্র আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দিয়ে নির্বাচনী আইনভঙ্গের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তার লাগাম টেনে ধরা কঠিন হয়ে পড়বে।
 
২৩৪ পৌরসভায় ভোটকেন্দ্র রয়েছে সাড়ে তিন হাজার। ভোটকেন্দ্রে ৭০ হাজার সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা ইসির। তারমধ্যে ৫০ হাজারই থাকবে আনসার-ভিডিপির সদস্য। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভোটের আগে দুই দিন ও পরে একদিন-এই চারদিন অর্থাত্ ২৮ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাঠে থাকবে। ফোর্সের মধ্যে পুলিশ, র্যাব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), ব্যাটালিয়ন আনসার মোতায়েন থাকবে।
 
ইসির কার্যপত্র অনুযায়ী, সাধারণ কেন্দ্রে ১৯ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২০ জন করে ফোর্স রাখা হবে। এর মধ্যে সাধারণ কেন্দ্রে অস্ত্রসহ ৫ জন পুলিশ, অস্ত্রসহ অঙ্গীভূত আনসার ২ জন, আনসার-ভিডিপির ১২ জন সদস্য লাঠিসহ (৬ জন পুরুষ ও ৬ নারী সদস্য)। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত অস্ত্রসহ একজন পুলিশ থাকবে। সাধারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেই ইসির। বরং গতানুগতিক ধারায় এবারো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিয়োগ করতে যাচ্ছে ইসি। অথচ ১ লাখ ৫৫ হাজার পুলিশের মধ্যে নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বে থাকবে ১৮ হাজারের মতো পুলিশ সদস্য। ১২ হাজার র্যাব সদস্যের কিছু স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে মাঠে রাখা হবে। বিজিবিও থাকবে একই ভূমিকায়।
 
ইসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বৈঠকের জন্য প্রস্তুত করা কার্যপত্রে সশস্ত্র বাহিনীর বিষয়ে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। তবে র্যাব ও বিজিবি সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। চারদিনের জন্য নির্বাচনী এলাকায় পুলিশ, এপিবিএন, ব্যাটালিয়ন আনসার, র্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড মোতায়েন থাকবে। মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে নিরাপত্তা সদস্যদের নেতৃত্বে থাকবেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। ভোটের দিন ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসাবে ভোটকেন্দ্রের বাইরে র্যাব ও পুলিশের টিম নিয়োগের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
 
বিধি লঙ্ঘনের বিচারের জন্য নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত থাকবে পৌরসভাভিত্তিক। প্রতি সাধারণ ওয়ার্ডে একটি করে মোবাইল ফোর্স হিসাবে ২ হাজার ১৯৩টি, প্রতি তিন ওয়ার্ডের জন্য একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে ৭৩১টি, প্রতি পৌরসভায় র্যাবের কমপক্ষে একটি টিম, প্রতিটি পৌরসভায় এক প্লাটুন বিজিবি এবং উপকূলীয় পৌরসভায় এক প্লাটুন করে কোস্টগার্ড মোতায়েনের প্রস্তাব করছে ইসি। সাড়ে তিন হাজার ভোটকেন্দ্রেই ভোটের দিন থাকবে ৬০ হাজারের বেশি ফোর্স। অবশিষ্ট ১০ হাজারের বেশি ফোর্স ২৩৪ নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনের দু’দিন থেকে অবস্থান নেবে।
 
বৈঠকে রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব, সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, এনএসআই, ডিজিএফআই, ডিবি ও কোস্টগার্ডসহ সব বাহিনীর প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।
 
আগামী ৩০ ডিসেম্বর (বুধবার) ২৩৪ পৌরসভায় ভোট হবে। এতে ২০টি দলের এবং স্বতন্ত্র মিলিয়ে মেয়র পদে ৯২৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ভোটের লড়াইয়ে থাকছেন। এছাড়া কাউন্সিলর পদে সাধারণ ৮ হাজার ৫৮৯ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ২৫৩৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বী লড়াই করবেন। এতে প্রায় ৭২ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
 
২০১১ সালে এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন পৌরসভা নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছিল। এরপর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে সেনা মোতায়েন ইসি চাইলেও তাতে সাড়া দেয়নি সরকার। এরপর উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে রিজার্ভ ফোর্স হিসাবে সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা হয়েছিল। সর্বশেষ গত ২৮ এপ্রিলের তিন সিটি নির্বাচনের সময় সেনা মোতায়েন করা হলেও তারা ক্যান্টনম্যান্টেই স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে অবস্থান করেছিল।
 
দুই ওসিকে প্রত্যাহারের নির্দেশ কমিশনের
 
পৌরসভা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে পুলিশের দুই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) নির্দেশনাটি পাঠিয়েছেন ইসির সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মিজানুর রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ নির্দেশনাটি পাঠানো হয়েছে।
 
এতে বলা হয়েছে মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানার ওসি এবং মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া থানার ওসিকে তাত্ক্ষণিকভাবে নিজ নিজ থানা থেকে প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওই দুই থানায় উপযুক্ত কর্মকর্তাকে পদায়নের জন্যও বলা হয়েছে।