‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ কবি সুকান্তের কবিতার চরণ দুইটির মর্ম ব্যাখ্যার মাধ্যমে ‘ভার্চুয়াল’ শব্দটির অর্থ স্পষ্ট করছি। কবিতায় একজন ক্ষুধার্ত ব্যক্তির কাছে পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদ কোনো সৌন্দর্যের অবতারণা করে না। ক্ষুধার তাড়নায় তার কাছে চাঁদটিকে রুটি বলে মনে হচ্ছে। কবিতায় বুভুক্ষু ব্যক্তির কাল্পনিক এই অনুভূতি হলো ভার্চুয়াল অনুভব যা বাস্তবের সঙ্গে মিল নেই। সুতরাং ভার্চুয়াল কথাটির অর্থ কৃত্রিম বা অপ্রকৃত।
মানুষ যখন তার মেধা, যোগ্যতা এবং পরিশ্রম দ্বারা জীবনের উন্নয়ন ঘটায় তখন সেই উন্নয়ন সমাজের কাজে লাগে এবং সমাজ উপকৃত হয়। সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেও সচ্ছল ও সুখী জীবনযাপন করে। সমাজে বিরাজ করে শান্তি ও শৃঙ্খলা। কিন্তু দুর্নীতি দ্বারা মানুষ যখন অর্থশালী হতে থাকে তখন সমাজের অবকাঠামো হয়ে পড়ে ভঙ্গুর এবং সেখানে বিরাজ করে চরম অস্থিরতা। এই অশান্ত সমাজ কখনও উন্নয়নের আদর্শ ক্ষেত্র হতে পারে না। কারণ, সেই সমাজের মানুষ নিজের কর্মের সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টায় নিয়োজিত না থেকে দুর্নীতিতে আত্মনিয়োগ করে। ফলে দেশের টেকসই উন্নয়ন পদে পদে বাধাগ্রস্ত হয়।
একটি দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম- ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মচারীর শতকোটি টাকার সম্পদ’। খবরে প্রকাশ, উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নং সড়কে তার পাশাপাশি দুটি ছয়তলা বাড়ি। আরো একটি বহুতল বাড়ির নির্মাণ কাজ চলছে। এগুলো ছাড়াও রয়েছে তার অঢেল সম্পদ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যক্তিটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৪র্থ শ্রেণির একজন কর্মচারী। আপাতদৃষ্টিতে সরকারের স্বল্প বেতনের এই কর্মচারী নিজেকে সফল ভাবছেন। আবার বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে এলাকার উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। কিন্তু আসলে কি এটি উন্নয়ন? তার এই প্রাচুর্য এসেছে সরকারি অর্থ আত্মসাতে সহায়তা করা ঘুষ থেকে। এরূপ অবৈধ ব্যক্তিগত উন্নয়ন রাষ্ট্রকে কখনো শক্তিশালী করে না বরং একে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর করে। ব্যক্তিগত অবৈধ উন্নয়ন কোনো দেশ বা জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। তাই এ ধরনের উন্নয়নকে ভার্চুয়াল বা অপ্রকৃত উন্নয়ন হিসেবে অভিহিত করা যায়।
খাদ্যে ভেজাল আরো একটি ভয়াবহ দুর্নীতি। ভেজাল যুক্ত খাদ্য বিক্রি করে অসাধু ব্যবসায়ীগণ লাভবান হচ্ছে। দিন দিন তাদের অর্থ সম্পদের কলেবর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের প্রতিটি জনগণের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য। জনগণের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিপন্ন হলে আমরা দুর্বল ও অসহায় জাতিতে পরিণত হব। মানব নির্ভর উন্নয়ন হয়ে পড়বে স্তব্ধ। তাই উন্নত দেশ গড়তে ভেজালবিরোধী অভিযান অপরিহার্য।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোনো কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে পূর্ব অনুমোদন ছাড়াই অনেক চাকরিরত দায়িত্বশীল ব্যক্তি ছুটি কাটান অথবা অনুপস্থিত থাকেন। অধস্তন কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, ‘স্যার ছুটিতে আছেন’। এটাও এক ধরনের গুরুতর দুর্নীতি। সরকারি নিয়মে ক্যাজুয়াল লিভ ২০ দিন। নিজের ব্যক্তিগত উন্নয়নের স্বার্থে অনেকেই কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য দিন অনুপস্থিত থাকেন। অনুমোদনহীন এই অনুপস্থিতিকে আমি ‘গায়েবী ছুটি’ হিসেবে আখ্যায়িত করি। এ ধরনের দুর্নীতিতে মুষ্টিমেয় লোকের ব্যক্তিস্বার্থ সংরক্ষিত হলেও দেশের মানুষ সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে যা দেশের অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে। সরকারের একান্ত দায়িত্ব এ ধরনের দুর্নীতি রোধে কঠোর হওয়া। দেশের জনগণ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা।
ইয়াবার রাজধানী খ্যাত টেকনাফের অলিতে গলিতে অসংখ্য সুরম্য অট্টালিকা গড়ে উঠেছে। এখানে নতুন কেউ আসলে মনে করবেন এখানে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রকট। কিন্তু টেকনাফের এই উন্নয়নকে কি আমরা প্রকৃত উন্নয়ন বলব ? দেশের সত্তর লাখ যুব সমাজকে নেশায় আসক্ত করে অবৈধ অর্থ দিয়ে এই উন্নয়ন। তাই এই উন্নয়নকে প্রকৃত উন্নয়ন বলা চলে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের উদাসীনতা ও দুর্বলতার কারণে এরূপ উন্নয়ন যত বেশি ঘটবে দেশও ততই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে। উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে যখন আমরা বিশ্বে পরিচিতি পাচ্ছি, ঠিক তখন এই উন্নয়নকে অবরুদ্ধ করতে পার্শ্ববর্তী দেশ বদ্ধপরিকর। ইয়াবার আগ্রাসনে যুব সমাজের কর্মশক্তি শূন্যের কোটায় ধাবিত হচ্ছে। তাই এর বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ ছিল সময়ের দাবি। সরকারের এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। দেশের রাজনীতিবিদ এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির যে ব্যক্তিবর্গ এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন এবং মাদকের মূলোত্পাটনে রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তারা নিঃসন্দেহে দেশের সূর্যসন্তান।
সুস্থ চিন্তা-চেতনার সবল মানুষই পারে পৃথিবী বদলে দিতে। জ্ঞান ও শ্রমভিত্তিক অর্থনীতির কারিগর মানবসম্পদ যদি দুর্নীতি, মাদক ও খাদ্যে ভেজালের কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে দেশের উন্নয়ন দূরের কথা, জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই দুষ্কর হয়ে পড়বে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন দূরদর্শী, সত্ এবং সফল রাজনীতিবিদ। তাঁর ভবিষ্যত্ চিন্তায় তিনি যে সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন তা সম্পূর্ণরূপে শ্রম ও মেধানির্ভর। তাই সুস্বাস্থ্য, সুস্থ-মানসিকতা এবং কর্মক্ষম জাতি গড়তে তিনি বিশেষ- ভাবে জোর দিয়েছেন মাদক, ঘুষ, দুর্নীতি ও ভেজাল বিরোধী অভিযানে। ২০৪১ সালের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে এর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার পূর্বের শাসনামলে জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনের সময় আবারও দুর্নীতি দমনের বিশেষ অঙ্গীকার করেছে। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি আছে। জাতির উদ্দেশে প্রথম দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, হয় নিজে থেকে শুধরাতে হবে, নইলে কঠোর ব্যবস্থা। জাতির অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে এবং উন্নত জাতি গঠনে সরকারের এই অভিযানে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। আমরা সেই দিনের স্বপ্ন দেখি, যেদিন দেশ হবে দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত এবং রচিত হবে আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা। তাই আসুন, স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা ভার্চুয়াল ও প্রকৃত উন্নয়নের পার্থক্য করি, সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ি।
লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ,
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর