ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচে লেনদেন বাড়ছে

দেশে কার্ডভিত্তিক ইলেকট্রনিক পেমেন্ট প্রসারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় ২০১২ সালের শেষের দিকে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশের (এনপিএসবি) কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিনিয়ত এনপিএসবি মাধ্যমে লেনদেন বাড়ছে। গত জানুয়ারি মাসে এনপিএসবির মাধ্যমে দৈনিক গড়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।

নানা প্রয়োজনে মানুষকে প্রতিদিন লেনদেন করতে হয়। আর এখন নগদ টাকার পরিবর্তে মানুষ প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেনে ঝুঁকছে। দেশের ৯ কোটি মানুষ এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ইন্টারনেট ভিত্তিক বিভিন্ন লেনদেনের মধ্যে এনপিএসবি’র মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছে। স্বল্প সময়ে সহজে ঝুঁকিমুক্তভাবে এ লেনদেন করার সুযোগ পাওয়ায় গ্রাহকরা এসব লেনদেনে ঝুঁকছে। এতে ব্যাংকের লাইনে দাঁড়ানোর ঝামেলা বা সরাসরি ব্যাংকের শাখায় যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। হাতে থাকা স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে এ লেনদেন করা যায়। কেনাকাটার ক্ষেত্রে নগদ টাকা বহনের পরিবর্তে প্লাস্টিক কার্ড বহনকে সুবিধাজনক মনে করছেন অনেকেই।

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি’র চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকের লেনদেন করলেও তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এখন সরাসরি ব্যাংকে যেতে চান না। তারা তাদের ব্যবহূত মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই ফান্ড ট্রান্সফার করে দেন। বর্তমানে মানুষ ঝামেলাবিহীনভাবে বিল পরিশোধের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। এতে খরচ, সময় উভয় বাঁচে।

দি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন বলেন, সিটি ব্যাংকের ১৫ শতাংশ গ্রাহক ইন্টারনেট ব্যাংকিং করে। সময়ের পরিবর্তনে এটা আরও বাড়বে। ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারও দিন দিন বাড়ছে বলে মনে করেন এ ব্যাংক। তিনি বলেন, ব্যাংকের শাখায় গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে গ্রাহকদের অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। আবার গ্রাহকদের বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকে যেতে পরিবহন খরচসহ নানান ঝামেলা পোহাতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, এনপিএসের আওতায় গত জানুয়ারিতে এটিএম কার্ডের মাধ্যমে ১৭ লাখ ৯৬ হাজার ৭২টি লেনদেনের বিপরীতে এক হাজার ২৮৫ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ সময়ে পয়েন্ট অব সেলস বা পসের মাধ্যমে তিন লাখ ৪৬ হাজার ৫৬৬টি লেনদেনের বিপরীতে ১২৫ কোটি ৬২ লাখ টাকার কেনাকাটা বা অন্য কাজে পরিশোধ করা হয়েছে। আর এ সময়ে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার করে ফান্ড ট্রান্সফার করতে জানুয়ারি মাসে ২৯ হাজার ৪৮৪টি লেনদেন করা হয়েছে। এসময় ৬২ কোটি ৮০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। জানুয়ারি মাসে আগের মাসের তুলনায় ইন্টারনেট ভিত্তিক ফান্ড ট্রান্সফার বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। আগের মাসের তুলনায় এটিএম বুথের ব্যবহার ও লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। তবে পসের মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা ও পরিমাণ কিছুটা কমেছে।

দেশে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ আর ডেবিট কার্ডের গ্রাহক প্রায় দেড় কোটি। এসব কার্ডধারী এনপিএবি’র আওতায় এটিএম ও পসের মাধ্যমে লেনদেন করছে। দেশে পস টার্মিনাল আছে ৫০ হাজারের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নভেম্বরের হিসাবে দেখা গেছে, দেশে এটিএম ট্রানজেকশনের জন্য এনপিএসবি সার্টিফাইড ব্যাংক রয়েছে ৫১টি। পস ট্রানজেকশনের জন্য সার্টিফাইড ব্যাংক ৫০টি এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং ফান্ড ট্রান্সফারের জন্য সার্টিফাইড ব্যাংক ১৯টি।

ইন্টারনেট ব্যাংকিং তহবিল স্থানান্তর বা আইবিএফটি পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্যাংক কর্মকর্তার কোনো ধরনের সহযোগিতা না নিয়ে গ্রাহক নিজেই আরেক ব্যাংকের গ্রাহককে পরিশোধ করতে পারেন। ফলে শাখায় গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হয় না। যদিও রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট বা আরটিজিএস, বাংলাদেশ অটোমেটেড চেক ক্লিয়ারিং হাউস (বিএসিএইচ) এবং ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার বা ইএফটিএনের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বেশ আগ থেকে ইলেকট্রনিক লেনদেন হচ্ছে। তবে এসব ক্ষেত্রে লেনদেন করতে ব্যাংকারের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। আইবিএফটি পদ্ধতিতে গ্রাহক নিজেই তহবিল স্থানান্তর করতে পারেন।

এটিএম বুথ ও কার্ডে থাকবে এনপিএসবি’র লোগো

জনপ্রিয় হওয়ায় এনপিএসবি লোগো তৈরি করা হয়েছে। এখন দেশের সব এটিএম বুথ, পস মেশিন, ই-কমার্স সাইট ও পেমেন্ট গেটওয়েতে এই লোগো বসানোর নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পর্যায়ক্রমে এটিএম কার্ডে এটি ব্যবহার করতে হবে। গতকাল এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে এটিএম বুথ ও পস মেশিন ও ডিজিটাল ডিসপ্লেতে এই লোগো ব্যবহার করতে হবে। চলতি বছরের আগস্ট থেকে নতুন ইস্যু করা ব্যাংকের নিজস্ব ব্রান্ডের কার্ডে এই লোগো ব্যবহার করতে হবে। পুরাতন কার্ডে পর্যায়ক্রমে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক ব্রান্ডের কার্ডে চুক্তি নবায়নের সময় এনপিএসবি লোগো ব্যবহার শর্ত নিশ্চিত করতে হবে। কার্ডের সম্মুখভাগের ডানদিকে এই লোগো ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ওই কার্ডটি কিভাবে ব্যবহার করতে হবে তার একটি নীতিমালাও তৈরি করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রঙ, নকশা ও ডিজাইন সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, এনপিএসবি চালুর আগে এক ব্যাংকের কার্ড অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথে ব্যবহার করলে ৪০ থেকে ৬০ টাকা চার্জ আদায় করা হতো। সুইচ হিসেবে ব্যবহূত হতো বিদেশি ভিসা, মাস্টারকার্ড, জেসিবি ইত্যাদি। এখন এনপিএসবি সুইচের মাধ্যমে এক ব্যাংকের কার্ড দিয়ে অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলন করলে খরচ হয় মাত্র ১৫ টাকা।