দেশ থেকে বহু দূরে। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে প্রায় অর্ধেকটা জীবন কাটিয়ে দেয়া। তবুও শরীরে পাই বাংলা মাটির গন্ধ। মনের মাঝে বাস করে বাংলা মা, মাটি এবং দেশ। দেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদদের স্বার্থপরতা, ভণ্ডামি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা মনের মধ্যে একটা বেদনার জন্ম দিলেও দেশের সাধারণ জনগণের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং তাদের বিরামহীন চেষ্টায় দেশের উন্নয়ন আমার কাছে সর্বদা ইতিবাচক। তাই প্রাণের দেশকে নিয়ে কাউকে ভাবতে কিংবা দেশের জন্য কিছু করতে দেখলে ভালো লাগে।
দেশ স্বাধীনতার ৪৪ বছরে বাংলাদেশ সরকার এবং আদালত চারজন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে। দেশদ্রোহীতায় পাকিস্তানের পক্ষের রাজাকার এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বিচার বিভাগের একের পর এক বিচার কার্যকরী করা পাকিস্তানীদের একদম ভাল লাগেনি। তাই বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকরের পর 'উদ্বেগ' প্রকাশ করে বিবৃতি দেয় পাকিস্তান। বাংলাদেশ সাহসের সাথে ঢাকায় পাকিস্তানী হাই কমিশনারকে ডেকে এর প্রতিবাদ করে। এর এক সপ্তাহের মধ্যে পাকিস্তান বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাই কমিশনারকে ডেকে একাত্তরে গণহত্যার দায় অস্বীকার করে।
স্বাধীন বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন বিষয়ে বিশ্বে নির্লজ্জ এবং সন্ত্রাসী দেশ বলে পরিচিত পাকিস্তানের নাক গলানো এবং অযাচিত হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ জানায় গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা। পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জোর দাবি জানায় তারা। ইতিমধ্যে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরুরি সিন্ডিকেট বৈঠকে পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশটির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'যত ধরনের সম্পর্ক রয়েছে' তা ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। পাকিস্তানের সাথে সকল প্রকার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিতে সাংবাদিকরা বিজয় দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ জনগণের কাছে মতামত জানতে চাইলে অধিকাংশ জনগণই পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষ্যে মন্তব্য করে।
এখানেই আমি খুঁজে পেয়েছি অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সার্থকতা। ৪৫ বছরে এসে বাংলাদেশকে আমি দেখি পরিপূর্ণ একটি স্বাবলমী দেশ; নতুন করে, নতুন রূপে। সোনার দেশ এবং তার জনগণের আত্মবিশ্বাস, দেশের জন্য দৃঢ় অঙ্গিকার দেখতে আমার বেশ ভালো লাগছে।
তবে বাংলাদেশে 'পাকিস্তানী পণ্যে'র ব্যবহার এবং ঢাক ঢোল পিটিয়ে 'পাকিস্তানি পণ্যে'র প্রচার এবং বানিজ্য বিষয়টা নিয়ে আমি বেশ উদ্বিগ্ন। মেয়েদের পোশাক এবং কাপড় অন্যতম পাকিস্তানী দু'টো পণ্য হলেও কাঁচা বাজারে পাকিস্তানী মসলা এবং মুরগিও বিক্রি হচ্ছে দেদারসে।
বিষয়টা হয়তো আমার মতো অনেককেই কষ্ট দেয়, কিন্তু মূল্য এবং ফ্যাশনের কথা বিবেচনা করে তারা নীরব থাকেন। কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি এখনই এই সকল বিষয়গুলো প্রতিরোধ করা প্রয়োজনীয়। একটি বাগান সম্পূর্ণভাবে পরিস্কার করতে যেমন মূলসহ ছোট বড় সবগুলো আগাছা একটি একটি করে তুলে ফেলতে হয়, ঠিক তেমনি বাংলাদেশকে পাকিস্তানের কালো ছায়া থেকে মুক্ত করতে আমাদের 'পাকিস্তানী পণ্য' বর্জন করায়ও বেশ সোচ্চার হতে হবে। সে ক্ষেত্রে 'মেইড ইন বাংলাদেশ'ই হোক একটা প্রধান স্লোগান। দেশ স্বাধীনতার পক্ষ্যের আমরাই পারি দেশের প্রতিটি মানুষের মধ্যে স্লোগানটি পৌঁছে দিতে এবং সকলকে জাগিয়ে তুলতে।
(লেখক : খুরশীদ শাম্মী, টরেন্টো, অন্টারিও)