প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংসদে এসে কথা বলার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, জনগণের ভোটের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সংসদে আসুন, যতো কথা বলার আছে বলুন, আমরা কোনো বাধা দেব না। সোমবার রাতে রাষ্ট্রপতি ভাষণ সম্পর্কে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাব এবং একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সমাপনী বক্তব্যে অংশ নিয়ে তিনি আরো বলেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নৌকার বিজয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটের রায়। জঙ্গি-সন্ত্রাস-মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগকেই বেছে নিয়েছে দেশের জনগণ। জনগণ আর জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস-মাদক-অগ্নিসন্ত্রাস আর দেখতে চায় না, নির্বাচনে তা প্রমাণিত হয়েছে। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। আলোচনা শেষে ধন্যবাদ প্রস্তাবটি ভোটে দিলে তা সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়।
সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে শপথ নিয়ে সংসদে আসার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে সংসদ নেতা বলেন, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যদের অনেকে সেনাপ্রিয় বলেন। দেশের এমন কিছু লোক আছে দেশে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি আসলেই তাদের সুবিধা হয়। তারা কোনো উন্নয়ন চোখে দেখে না। তবে তারা কে কি বললো তাতে কেয়ার করি না, আমি কেয়ার করি দেশের জনগণকে। তাদের মতো অতো জ্ঞানী-গুণি না হলেও দেশকে আমরা উন্নয়ন করতে পারি তা প্রমাণ করেছি। এখন ভিক্ষা দেওয়ার কোনো লোক পাওয়া যায় না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ আমরা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলবো। এ বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শান্তিপূর্ণ দেশ। ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবো মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ। আর ২১০০ সালে ডেল্টা প্লান বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশগুলোর একটি হবে বাংলাদেশ।
বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো চুক্তি নয়, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। রাশিয়া, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভিয়েতনামসহ প্রতিরক্ষা চুক্তি পৃথিবীর অনেক দেশের সঙ্গে আছে। সৌদি আরবের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করেছি অবকাঠামো নির্মাণ, কারিগরি সহায়তায়, দেশটির স্থল সীমানায় মাইন অপসারণের জন্য। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, অন্য কোনো দেশে যুদ্ধ হলে সেখানে আমাদের সেনাবাহিনী সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। পবিত্র মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তার রক্ষার প্রয়োজন হয়, সেখানে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী কাজ করবে। এখানে ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের কাছে যে ওয়াদা দিয়েছি, তা রক্ষা করাই আমাদের কাজ। দুর্নীতি করতে আসিনি, জনগণের সেবা করতে এসেছি। দুর্নীতি অনেক কমিয়ে আনতে পেরেছি। চেষ্টা করে যাচ্ছি দুর্নীতি দূর করে উন্নয়ন করতে। দুর্নীতি যথেষ্ট কমাতে পেরেছি বলেই এতো উন্নয়ন-সমৃদ্ধি দৃশ্যমান হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদে দেওয়া ভাষণে সরকারের কার্যক্রম বিষদভাবে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে তা তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশকে আরও উন্নত করতে অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনেক ভূমিকা রাখবে। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী ট্যানেল নির্মাণ কাজ শুরু করেছি। আমরা প্রতিটি গ্রামকে শহরের সুবিধা সম্বলিত করে গড়ে তুলবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক সময় বাংলাদেশ বলতেই বুঝতো বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, দুর্ভিক্ষের দেশ। এখন তা কেউ বলে না। এখন উন্নত বিশ্বও বলে বাংলাদেশ মানে উন্নয়নের রোলমডেল। সেই সম্মানটা আমরা অর্জন করেছি। আমরা উন্নত অনেক দেশের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। দেশটাকে আমরা উন্নত করতে বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছি। দেশের ভেতরে সংঘাত, সংঘর্ষ, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক থাকবে না, এর বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস-মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে কীভাবে আগামী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই তা স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণত কোন দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু আমরা পর পর দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থেকে ব্যাপকভাবে উন্নয়নের কাজ করেছি বলেই জনগণ আমাদের প্রতি আস্থা রাখতে পেরেছে। জনগণের মধ্যে আস্থা-বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে বলেই তারা আওয়ামী লীগের পক্ষে গণরায় দিয়েছে।
কওমী মাদ্রাসা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, দীর্ঘদিন কওমী মাদ্রাসা পাঁচটি বোর্ডে বিভক্ত ছিল। মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা নিয়ে কোথাও চাকরি করতে পারতো না। এরা তো দেশেরই সন্তান, তাদেরকে আমরা ফেলে দেব। কারিকুলাম তৈরি করে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় সেজন্য উদ্যোগ নেই। দাওরাইয়ে হাদিসকে আমরা মাস্টার্সের স্বীকৃতি দিয়েছি। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি পার্থিব শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। মাদ্রাসা জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের কারখানা এ অভিযোগের সঙ্গে আমি একমত নই। হলি আর্টিজানের ঘটনায় দেখা গেছে, ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা উচ্চবিত্তের সন্তান জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছে।