নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভারি যান চলাচল করায় কেপিআই ওয়ান ক্যাটাগরির দেশের সর্ববৃহত্ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজে ফের ফাটল দেখা দিয়েছে। কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কিছু সদস্য টাকার বিনিময়ে সিসি ক্যামেরা অচল করে রেখে ব্যারাজের উপর ভারি যান চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছেন বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে, ফাটলের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ব্যারাজটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এটিকে সরাসরি ফাটল না বলে ‘হেয়ার লাইন ক্র্যাক’ বলে আখ্যায়িত করছেন।
এর আগে ব্যারাজে ফাটল দেখা দেয়ায় ২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে ব্যারাজের উপর দিয়ে সকল প্রকার ভারি যান চলাচল বন্ধ করে দেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের ৫ ও ৬ জানুয়ারি তিস্তা ব্যারাজ পরিদর্শন করেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম। এসময়ে তিনি ব্যারাজের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও আনসারকে অপসারণ করে নতুনভাবে নিরাপত্তা সদস্য নিয়োগ এবং দ্রুত সিসি ক্যামেরা চালু করার নির্দেশ দেন। কিন্তু এরপরও তিস্তা ব্যারাজের উপর দিয়ে ভারি যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়নি, বদলি করা হয়নি নিরাপত্তা সদস্যদের। সিসি ক্যামেরাও নিয়মিত চালু রাখা হয় না।
গত শুক্রবার বিকালে সেখানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিস্তা ব্যারাজের মোট ৫২টি স্লুইস গেটের মধ্যে ২, ১৬, ১৭, ১৮, ২৩, ২৪, ২৭ ও ২৮ নম্বর স্লুইস গেটের পাশে মূল ব্যারাজের উপরিভাগে ফাটলগুলো স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, কয়েক বছর আগে ইজারার মাধ্যমে ব্যারাজটির উপর দিয়ে যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। সেখানে ২২ মেট্রিক টনের উপর যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞাও ছিল। সে সময় প্রভাবশালী ইজারাদার ও ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে তিস্তা ব্যারাজের উপর দিয়ে ৪০ মেট্রিক টন ওজনের মাল বোঝাই ট্রাক চলাচল করতো। এতে করে ব্যারাজে ফাটল সৃষ্টি হয়। ফলে ২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বর ইজারা বাতিল করে ব্যারাজের উপর দিয়ে সকল প্রকার ভারি যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি ব্যারাজে স্থাপন করা হয় সিসি ক্যামেরা। কিন্তু সম্প্রতি ওই চক্রটি ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের যান্ত্রিক বিভাগের কিছু কর্মকর্তার সাথে গোপন আঁঁতাতের মাধ্যমে সিসি ক্যামেরাগুলো অকেজো করে রাখে। ওই কর্মকর্তারা সন্ধ্যা নামতেই মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে মাল বোঝাই ট্রাক চলাচলের সুযোগ করে দেন। ডালিয়া ও দোয়ানী এলাকার স্থায়ী বসবাসকারীরা জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে ভোর রাত পর্যন্ত ব্যারাজের উপর দিয়ে ভারি যানবাহন চলাচল করে এবং বর্তমানে এর পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে।
জানা গেছে, পণ্য বোঝাই ট্রাক প্রতি ৩শ’ থেকে ৫শ’ করে টাকা নেন ব্যারাজের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। অথচ ব্যারাজের দুই ধারের প্রবেশদ্বারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের টানানো সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে ব্যারাজের উপর দিয়ে সকল প্রকার ট্রাক, বাসসহ ভারি যান চলাচল সম্পূর্ণ নিষেধ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তার উল্টো চিত্র।
তিস্তা ব্যারাজের উপর যাওয়ার জন্য দু’পাশে দুটি করে মোট চারটি গেট রয়েছে। একটি বড় এবং অপরটি ছোট। সিএনজি অটোরিক্সা, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসসহ হালকা যানগুলো নিয়মিতভাবে ব্যারাজের বৃহদাকার মূল ফটকের পাশে ছোট একটি গেট দিয়ে ঢুকে তিস্তা ব্যারাজের উপর দিয়ে নিয়মিতভাবে চলাচল করছে। আর নির্ধারিত ওজনের বেশি ট্রাক বাস যাতে ঢুকতে না পারে, তা নিয়ন্ত্রণের জন্য বন্ধ রাখা হয় মূল গেট দুটি। নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ওজনের বাস-ট্রাক এলেই কেবল সেই গেট দুটি খুলে দেয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে গিয়ে দেখা গেল অন্য দৃশ্য। গরু ও ইটভর্তি কয়েকটি ট্রাক এলে আনসার সদস্যরা টাকার বিনিময়ে মূল গেটটি খুলে দিলেন। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুলিশ সদস্যকেও ওইসব ট্রাক থেকে টাকা আদায় করতে দেখা যায়। এসময় ক্যামেরা তাক করতেই সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নেন ওই পুলিশ সদস্য।
এই অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিস্তা ব্যারাজ দোয়ানী পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বরত ইনচার্জ এসআই মিজানুর রহমান মিজান বলেন, “আমরা ট্রাক থেকে টাকা নেই না। এটি আনসাররা দেখা শোনা করেন”। একইভাবে টাকার বিনিময়ে মাল বোঝাই ট্রাক পার হতে দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিস্তা ব্যারাজ আনসার ক্যাম্পের ইনচার্জ জোনাব আলীও।
ব্যারাজে নতুন করে ফাটল দেখা দেয়ার বিষয়ে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী হাফিজুল হক বলেন, তিস্তা ব্যারাজ দেশের একটি জাতীয় সম্পদ। তাই ব্যারাজটিকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষায় ভারি যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এরপরেও যদি কেউ গোপনে ট্রাক চলাচলের সুযোগ করে দেয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যদিকে বর্তমানে ব্যারাজে যে ফাটল দেখা দিয়েছে তা ‘হেয়ার লাইন ক্র্যাক’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি মেরামতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।