দিনভর নানা নাটকীয়তার পর ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুরকে বরণ করে নিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। গতকাল মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) উপস্থিত হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কেলাকুলি করে অভিনন্দন জানান শোভন। এর আগে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে নুরুল হককে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর প্রতিনিধি দাবি করে তাকে বহিষ্কার এবং ভিপি পদে পুনঃনির্বাচন দাবি করে আসছিল ছাত্রলীগের একাংশ।
এদিকে ডাকসু নির্বাচনকে ডাকাতির নির্বাচন দাবি করে পুনরায় তফসিল প্রকাশ এবং পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়ে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এছাড়া নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হকসহ বামজোট এবং স্বতন্ত্র জোটের প্রার্থীরাও নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সামাদ বলেছেন, ডাকসুতে পুনঃনির্বাচনের কোন সুযোগ নেই।
ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর নুরুল হক নুর বিজয় মিছিলে অংশ নিতে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। মিছিলটি শাহবাগ থেকে শুরু হয়ে মধুর ক্যান্টিন এবং কলাভবন প্রদক্ষিণ করে টিএসসিতে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশ শেষে নুরুল হক যখন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছিলেন তখন ছাত্রলীগের সভাপতি শোভনের অনুসারীরা লাঠি-সোটা নিয়ে তার উপর হামলা চালায়। এসময় পাশে থাকা ছাত্রদলের নেতারা ছাত্রলীগকে বাধা দিলে সংঘর্ষে ছাত্রদলের একজন আহত হয়। পরবর্তীতে বামজোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা টিএসসিতে এসে নুরের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল বের করে এবং অপরাজেয় বাংলায় সমাবেশ করে ছাত্রলীগের হামলাকারীদের বিচার ও অবিলম্বে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানান। এসময় নুরুল হক পুনরায় নির্বাচনের তফসিল দেওয়ার আগ পর্যন্ত লাগাতার ধর্মঘটের কর্মসূচি দেন। পরবর্তীতে তিনি টিএসসিতে অবস্থান নিলে নেতা-কর্মীদের নিয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন টিএসসি মিলনায়তনে প্রবেশ করেন। এ সময় সেখানে ছাত্রলীগ ছাড়াও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সবার উপস্থিতিতে শোভন নুরুল হককে বুকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানান। সেখানে শোভন বলেন, ‘আমাদের সবার চাওয়া-পাওয়া নুরুল হক পূরণ করবে। আমি পারিনি কী হয়েছে, নুরুল হক তা পূরণ করবে। সে জন্য সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, যেন স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ঠিক থাকে।’ এ সময় নুরুল হক ছাত্রলীগ সভাপতির সঙ্গে সহমত পোষণ করেন।
পরে নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক বলেন, ‘ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের যে ঘোষণা দিয়েছিলাম, তা থেকে আমরা সরে এসেছি। তবে পুনর্নির্বাচনের দাবি অব্যাহত থাকেব। আমরা শিক্ষার্থীদের রায় মেনে নিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে এক সাথে কাজ করব।’ তিনি আরো বলেন, ‘ছাত্রলীগ আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। আমি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে চাই। আমার ওপর ছাত্রলীগ যে হামলা করেছে, সেটার বিচারের দায়িত্ব আমি ছাত্রলীগ সভাপতির ওপর দিলাম। তিনি বড় ভাই হিসেবে এটা দেখবেন। ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের যে ঘোষণা দিয়েছিলাম, সেটা প্রত্যাহার করে নিলাম। আর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকও পুনর্নির্বাচন চেয়েছেন, সে জন্য আমিও পুনর্নির্বাচনের জন্য প্রশাসনকে বলব।’
এর আগে শোভনের অনুরোধে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে থেকে সরে যান ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। সেখানে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, ‘আমাদের সবাইকে নিয়েই চলতে হবে। ক্যাম্পাসের পরিবেশ ঠিক রাখতে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চাই। আমি সবাইকে অনুরোধ করব এখান থেকে সরে যেতে।’
নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ
‘ভোট ডাকাতির’ অভিযোগে ডাকসু নির্বাচন প্রত্যাখ্যান ও পুনঃতফসিল ঘোষণার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। গতকাল সকালে ধর্মঘটের কর্মসূচি পালন করে ছাত্রদল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন দলটির নেতাকর্মীরা। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে সেটি অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে গিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশে মিলিত হয়।
সমাবেশে ছাত্রদল প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গতকাল ভোট ডাকাতির যে নির্বাচন হয়েছে, সে নির্বাচন বাতিলের দাবি জানাচ্ছি আমরা। ভিসিসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সব শিক্ষকের পদত্যাগ দাবি করছি। ডাকসু নির্বাচনের জন্য যে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, সেটি পুনর্গঠন করে পুনঃতফসিল ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি।’
এ সময় মোস্তাফিজুর রহমান আরো বলেন, ‘এটা ষড়যন্ত্রের নির্বাচন। রেজাল্ট পরিকল্পিত। তাই এ ফল প্রত্যাখ্যান করছি।’ ছাত্রদলের পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আজকের কর্মসূচির পর পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’ পরে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে টিএসসির দিকে চলে যান ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী, ছাত্রদলের প্যানেল থেকে ডাকসু নির্বাচনের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী খন্দকার আনিছুর রহমান (অনিক) উপস্থিত ছিলেন।
ডাকসু নির্বাচন বাতিলের সুযোগ নেই : উপ-উপাচার্য
নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সংগঠনের দাবির প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সামাদ বলেছেন, ‘এ নির্বাচন বাতিলের সুযোগ নেই।’ গতকাল মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। অধ্যাপক সামাদ বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন যেভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সারা দেশের মানুষ মিডিয়ার মাধ্যমে দেখেছে। আপনারা নিজেরা সাক্ষী। একটি হলে সামান্য অনিয়ম হয়েছে, আমরা তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছি। আরেকটা হলে কোনো অনিয়ম হয়নি, সেখানে হাঙ্গামা হয়েছে, আমার ভাষায়। কাজেই ডাকসু নির্বাচন যারা বর্জন করেছে, সেটা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, নিজস্ব ব্যাপার। বর্জন করার বা এখন বাতিলের দাবি এটা করার সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয় না।’
গত সোমবার ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল দুপুরেই তা বর্জন করে পুনরায় ভোট গ্রহণের দাবি জানায় ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য সব সংগঠন। সোমবার দিবাগত রাতে ফল ঘোষণায় দেখা যায়, ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুর। এরপরই ভিপি পদের ফল প্রত্যাখ্যান করে ছাত্রলীগ। ওই পদে পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ করে তারা।