ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। আর বিতরণ হওয়া ঋণ আদায়ও করা যাচ্ছে না। ফলে ওইসব খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশনও রাখতে হচ্ছে। তাতে মূলধন ঘাটতিতে পড়ছে ব্যাংক। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না।
অবশ্য খেলাপি ঋণ কমাতে দেদার ঋণ পুনঃতফসিল করছে বেশিরভাগ ব্যাংক। এর পরও না কমে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। এর প্রভাবে মূলধন ঘাটতি মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে ১০টি ব্যাংক। ২০১৮ সাল শেষে এসব ব্যাংকের ২৬ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এক বছর আগে আট ব্যাংকে ১৯ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ। আর খেলাপি ঋণের কারণেই মূলধন ঘাটতিও বাড়ছে। বেসরকারি ব্যাংকে ঘাটতি বেশি না হলেও সরকারি খাতে ঘাটতি অনেক বেশি। সরকারি ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের ঘাটতি পূরণ করা হয় জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে। যা মোটেও উচিত নয়। এটি বন্ধ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে খেলাপি হয়ে গেছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ হওয়া ঋণের ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। আগের বছর অর্থাত্ ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। যা ছিল ওই বছরের বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। খেলাপি ঋণ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মূলধন ঘাটতি বাড়ে। ১০টি ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের মূলধন ঘাটতি থাকলেও কিছু ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রাখতে সক্ষম হয়েছে।
মূলধন ঘাটতির তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৭টি সরকারি মালিকানার। বাকি ২টি বেসরকারি খাতের এবং একটি বিদেশি খাতের। সরকারি ছয় ব্যাংকে ঘাটতি রয়েছে ২৪ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের দক্ষতা না বাড়িয়ে জনগণের করের টাকায় বারবার মূলধন জোগান নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে। কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি ব্যাংকের জন্য দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডিসেম্বরে কৃষি ব্যাংকের সর্বোচ্চ মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় ৮ হাজার ৪৪৭ কোটি। আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির ঘাটতি ছিল মাত্র ৮১৩ কোটি টাকা। একইভাবে জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৫ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে ছিল মাত্র ১৬১ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি হয়েছে ৫ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। আগের বছরের চেয়ে গত বছরে এ ব্যাংকের ঘাটতি কিছুটা কমেছে। বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি হয়েছে ৩ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে ছিল ২ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংক নতুন করে ঘাটতিতে পড়েছে। এ ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৮৩ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে রূপালী ব্যাংকের ৬৩৭ কোটি টাকা ঘাটতি থাকলেও গেল বছরে এ ব্যাংকের কোন মূলধন ঘাটতি ছিল না। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ১০১ কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ৭১২ কোটি টাকা।
এছাড়া আইসিবি ব্যাংকের ঘাটতি রয়েছে এক হাজার ৫৫২ কোটি, এবি ব্যাংকের ১০০ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। বিদেশি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের ৪০ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।
ব্যাংকগুলোর শেয়ারহোল্ডার বা মালিকদের জোগান দেওয়া অর্থই মূলধন হিসেবে বিবেচিত। সারাবিশ্বে বাসেল কমিটি প্রণীত আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাসেল-৩ নীতিমালার আলোকে একটি ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ অথবা ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি সে পরিমাণ মূলধন রাখতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক দিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরছে না। উদ্যোক্তারা নতুন করে বিনিয়োগে আসছেন না। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেকেই শিল্পকারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়ছে না, অন্যদিকে আগে বিতরণ হওয়া ঋণের টাকাও ফেরত পাচ্ছে না ব্যাংক। ফলে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যে সুদহার কমেছে তার ইতিবাচক প্রভাব ব্যাংকিং খাতে পড়তে সময়ে লাগবে বলেও মনে করছেন তারা। আর বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা কিছুটা কাজে লাগলেও সামগ্রিকভাবে তা খেলাপি ঋণ কমাতে পারছে না বলে জানান তারা।