তিন সপ্তাহের ব্যবধানে নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে আবারো হেইট ক্রাইমের শিকার হলেন একজন বাংলাদেশি। স্থানীয় সময় শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে নিউইয়র্কের ব্যস্ততম ব্রঙ্কসের সেন্ট লরেন্স ৬ ট্রেন সাবওয়ের কাছে একদল কৃষ্ণাঙ্গ সন্ত্রাসী বাংলাদেশি ক্যাব চালক আতাউর রহমানের ওপর হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা তাকে বেদম মারপিট করে রাস্তায় ফেলে রাখে।
এর আগে ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার এলাকায় মসজিদ থেকে বাসায় ফেরার পথে হামলার শিকার হন বাংলাদেশি মজিবুর রহমান।
হামলার শিকার আতাউর রহমানের বড় ছেলে মাহমুদুর লিমন সাংবাদিকদের জানান, প্রতি দিনের মতো পার্কচেস্টারের কাছে ভার্জিনিয়া এভিনিউর বাসা থেকে কাজে বের হয়ে যান আতাউর রহমান। রাত সোয়া ১১টার দিকে ক্যাসল হিল থেকে শিশুসহ এক হিসপ্যানিক যাত্রী তার ক্যাবে ওঠে। তাকে সেন্ট লরেন্স এবং ১৭২ স্ট্রিটে নামিয়ে দেন আতাউর।
এ সময় ওই যাত্রী ভাড়া না দিয়ে চলে যেতে চাইলে আতাউরের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। পুলিশ কল করার কথা বললে ২০ ডলারের একটি নোট বের করে দেয় ওই যাত্রী। ১০ ডলার ভাড়া রেখে বাকি টাকা যাত্রীকে ফেরৎ দেন ক্যাবি আতাউর। কিন্তু ওই যাত্রী তার সঙ্গে থাকা শিশুটিকে পাশের দোকানে রেখে কয়েক মিনিটের মধ্যেই একদল কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে সঙ্গে নিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আতাউরের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
কৃষ্ণাঙ্গ যুবক মদের বোতল দিয়ে মুখে আঘাত করলে আতাউর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় হামলাকারীরা তাকে বেদম পেটাতে থাকে। এতে তার ১২টি দাঁত ভেঙ্গে যায়। এই ঘটনা আশেপাশে সবাই দেখলেও তাকে উদ্ধারে কেউ এগিয়ে আসেনি। দীর্ঘ সময় ধরে এ হামলার পর রক্তাক্ত আতাউর ‘হেল্প হেল্প’ বলে চিৎকার করতে থাকলে দুই তরুণী পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ এসে সংজ্ঞাহীন আতাউরকে জ্যাকবি হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
এ ঘটনার পর আতাউরের পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বাড়ির বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন আতাউরের বড় ছেলে লিমন। তিনি বলেন, 'আমরা পুরো পরিবার আতঙ্কে তিন কাটাচ্ছি।'
তিনি অভিযোগ করে বলেন, 'মারাত্মক আহত আমার বাবাকে হাসপাতালে রাখা হয়নি। রাতেই তাকে অজ্ঞাত কারণে রিলিজ দেয়া হয়। তিনি চিকিৎসা অবহেলার শিকার হয়েছেন। এ ঘটনার পর ওই এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশিদের মধ্যে এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সময় রবিবার দিবাগত রাতে হামলার শিকার আতাউরকে দেখতে যান বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা। তারা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটি কাউন্সিলের সভাপতি আইনজীবী মোহাম্মদ এন. মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক নজরুল হক, সিলেট দক্ষিণ সুরমা এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা রিয়াজ উদ্দিন কামরান, সভাপতি অধ্যাপক খলিলুর রহমান, সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন, পার্ক চেস্টার জামে মসজিদের সভাপতি ওয়াহিদ নাজিম, বাংলাদেশ সোসাইিিট অব ব্রঙ্কসের সভাপতি এন ইসলাম মামুন, বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কসের সভাপতি শামীম মিয়া, অ্যাসাল ব্রঙ্কস চ্যাপ্টারের সেক্রেটারি মোজাম্মেল হোসেন মুরাদ, ব্রঙ্কস বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক শাহেদ আহমেদ।
এদিকে এশিয়ান আমেরিকান বিশেষ করে বাংলাদেশিদের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিউইয়র্কের ৯ কংগ্রেসম্যান। তারা এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে নিউইয়র্ক পুলিশ প্রধানের কাছে চিঠি দিয়েছেন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সিটির পুলিশ কমিশনার উইলিয়াম জে, ব্রাটন বরাবরে পাঠানো এক পত্রে স্বাক্ষরকারী কংগ্রেসম্যানরা হলেন যোসেফ ক্রাউলি, গ্রেস মেং, নিদিয়া ভ্যালেস্কুয়েজ, স্টিভ ইসরাইল, হাকিম জেফরি, জেরাল্ড নেদলার, চার্লস র্যাঙ্গল, হোজে সিরানো এবং গ্রেগরি মিক্স।
কংগ্রেসওমেন গ্রেস মেং সাংবাদিকদের বলেন, 'এশিয়ান-আমেরিকানদের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনা আমাকে ব্যাথিত করেছে। এ নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন। আমি আশা করছি, আমাদের ওই চিঠি পেয়ে পুলিশ কমিশনার উদঘাটনে সক্ষম হবেন যে, কেন ঘটছে এমন ঘটনা। এহেন গুরুতর অপকর্ম রোধেও যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে আশা করছি।'
পত্রে স্বাক্ষরকারী সবাই ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য এবং নিউইয়র্ক সিটি মেয়র বিল ডি ব্লাজিও একই পার্টির। মেয়রই মনোনয়ন দিয়েছেন পুলিশ কমিশনারকে।
সম্প্রতি ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক আচরণ শিকার হয়েছেন দুই বাংলাদেশি। কয়েকজন শিখ, চায়নিজ এবং পাকিস্তানি হামলার শিকার হয়েছেন।