নওগাঁর মান্দা উপজেলার ইব্রাহিম হোসেন সুস্থ্য স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন। পল্লী বিদ্যুতের লাইনমানের চাকরিও করতেন। ২০০৫ সালে সহকর্মীর অসাবধানতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার দুই হাত পুড়ে যায়। পরে জীবন রক্ষার্থে তার দু’টি হাতই কেটে ফেলতে হয়। পা দুটিও অচল হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত প্রতিবন্ধী। মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে ফিরে ইব্রাহিম হোসেন মল্লিক এখন একজন পুরোদস্তুর চিত্রশিল্পী। তার মুখে ধরা তুলির ছোঁয়ায় ক্যানভাসের কাগজের পাতায় অবিকল ফুল, ফল, পাখি, নদীসহ নানা রং-বেরঙয়ের ছবি। শুধু ছবিই নয়, যেন একেকটি জীবন্ত দৃশ্য।
সোমবার সকালে রাজশাহী মহানগরীর মহিষবাথান এলাকায় ‘আফসার হোসেন সিআরপি কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন ইব্রাহিম হোসেন মল্লিক। সেখানেই তিনি একটি হুইল চেয়ারে বসে বিশেষ কায়দায় বানানো রং-তুলির স্ট্যান্ডে মুখ দিয়ে নানা ছবি এঁকে যাচ্ছিলেন তিনি। মুখ দিয়ে ধরা তুলির আচড়ে তার ছবি অঙ্কনের দৃশ্য দেখে অনুষ্ঠানে আগত অতিথিরা মুগ্ধ হন।
ইব্রাহিম জানান, তিনি পল্লী বিদ্যুতের লাইনম্যানের চাকরি করতেন। ২০০৫ সালে পল্লী বিদ্যুতের কাজ করতে গিয়ে ভুল করে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ওপেন করে দেয় আরেক কর্মী। এতে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ইব্রাহিম। তাকে উদ্ধার করে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে জীবন বাঁচাতে তার দুটি হাত কেটে ফেলেন চিকিৎসকরা। কমর থেকে নিচের দিকেও শক্তিহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু মনের দুর্বলতা হার মানেনি ইব্রাহিম মল্লিকের। তাই মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে ইব্রাহিম সাভারের সিআরপি কেন্দ্রে চিকিৎসার সময় মুখে তুলি ধরে ছবি আকার প্রশিক্ষণ নেন ইব্রাহিম। সেই থেকে ১০ বছর ধরে তিনি মুখ দিয়েই নানা ধরনের ছবি এঁকে চলেছেন।
তিনি আরো বলেন, প্রতি দিন গড়ে একটি করে এবং মাসে অন্তত ৩০টি ছবি আঁকতে পারেন তিনি। ওই ছবি প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেন। বিশেষ করে বিদেশিরাই তার ছবির প্রধান ক্রেতা। দেশের সৌখিন ক্রেতারাও কিনেন ইব্রাহিমের মুখ দিয়ে আঁকা নানা ধরনের ফুল, ফল, নদী, পাল তোলা নৌকা, গ্রামীণ নানা কল্পনার দৃশ্য্যের ছবি। ছবি বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলছে ইব্রাহিমের সংসার। বাবা মারা যাওয়ায় ইব্রাহিমের সংসারে এখন আছেন মা, বড় ভাই, ভাবি ও তাদের দুই ছেলে-মেয়ে। দরিদ্র সংসারটি ইব্রাহিমের আয়ও বড় ধরনের সহায়তা করে।