সিলেটে পাহাড়-টিলা কাটা থামছে না

সিলেটের পাহাড়-টিলা কাটা অব্যাহত রয়েছে। পরিবেশবিনাশী এই কর্মকাণ্ড বন্ধ না হওয়ার ফলে সিলেটের নৈসর্গিক সৌন্দর্য হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

 

পাহাড়-টিলা কাটা বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার কথা বলা হলেও মাটি বেচার কারবারীদের কাছে এসব শুধুই ‘নীতিবাক্য’। তারা পাহাড়-টিলা কাটার মতো লাভজনক কারবার ছাড়তে রাজি নয়। কারণ- প্রথমত: টিলার মাটি চড়া দামে বিক্রি হয়। দ্বিতীয়ত: টিলা কাটা ভূমি আবাসনের জন্য প্লট হিসাবে ভালো দামে বিক্রি হয়ে থাকে। এই কারবারের সাথে জড়িতদের অনেকেই এখন কোটিপতি।

 

সবুজ বনবনানী,  চা-বাগানশোভিত সিলেটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রচুর পাহাড় ও টিলা, পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে গেছে ঝরণাধারা। এই অনুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আকর্ষণেই পর্যটকেরা ভিড় করে থাকেন এই ভূস্বর্গে।  কিন্তু পাহাড়-টিলা কর্তনকারীদের দৌরাত্ম্যে সিলেটের  নৈসর্গিক সৌন্দর্যও হারিয়ে যেতে বসেছে।  পাহাড়-টিলা কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। প্রশাসনের নাকের ডগায় তারা পাহাড় কেটে ট্রাকের পর ট্রাক মাটি অবাধে বিক্রি করছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নিষেধ সত্ত্বেও সম্প্রতি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টিলা কাটার দৃশ্য সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে।  সিলেট নগরীর অদূরে সিলেট-তামাবিল সড়কের পাশে অবস্থিত খাদিমপাড়া জহিরিয়া এমই হাই স্কুল নামক সেই স্কুলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল,  ৩০-৩৫ ফুট উঁচু টিলা কর্তনের হূদয়বিদারক দৃশ্য। ১০-১৫ জন নারী-পুরুষ এক সাথে সবুজ টিলাটিকে কোদাল, শাবল দিয়ে  কেটে উপর থেকে ধসিয়ে দিচ্ছে। আর নিচে ফেলা মাটি ট্রাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। টিলাটি  যেভাবে কাটা হয়েছে তাতে এখন কাটা বন্ধ করলেও বৃষ্টি হলে  সেটি ধসে পড়বে। অর্থাত্  এক সময় টিলাটি তার অস্তিত্ব হারাবে। এভাবেই সিলেটের বিভিন্ন স্থানে টিলার অস্তিত্ব মুছে দেয়া হচ্ছে।

 

শুক্রবার জহিরিয়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ইত্তেফাককে জানান, উপজেলা প্রশাসন, বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তি ও স্কুল কমিটির গোচরে এনেই টিলার কিছু অংশ কাটা হচ্ছে এবং তা স্কুলের স্বার্থেই। তিনি জানান, বৃষ্টির সময় টিলা বেয়ে স্কুলের একটি বারান্দায় পানি এসে ডুবে যায়।  এজন্যই টিলার কিছু অংশ কাটা হয়েছে। বর্তমানে কাটা বন্ধ রয়েছে। টাকার বিনিময়ে টিলার মাটি কাটতে দেয়া হয়েছে-এমন অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন “এটা সত্য নয়। যারা মাটি নিচ্ছে তারা তাদের খরচেই মাটি নিয়েছে।” এলাকাবাসী জানান, স্কুলের পেছনে দেয়ালের চক, কুনির চকসহ বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় টিলা কাটা চলছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিলেট সদর, জৈন্তাপুর,  গোয়াইনঘাট,  ফেঞ্চুগঞ্জ,  গোলাপগঞ্জ উপজেলার শতাধিক পাহাড়-টিলা কেটে সাবাড় করা হয়েছে। এলাকাবাসী বলছেন, পাহাড় ও টিলাগুলো দ্রুত রক্ষায় এগিয়ে না আসলে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। অচিরেই হারিয়ে যাবে সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

 

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, পাহাড়-টিলা কাটার বিরুদ্ধে প্রতি মাসেই কিছু না কিছু অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা আদায় করা হয়। অভিযানের পর কিছুদিন এই অপতত্পরতা বন্ধ থাকলেও  পরে আবার যেই কে সেই। পাহাড় কর্তনকারীরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। তারা কোন কিছুরই তোয়াক্কা করে না। সিলেট বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, তারা সীমিত লোকবল নিয়েই নিয়মিত পাহাড় টিলা কাটার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। সূত্র মতে, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে পাহাড়-টিলা কাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর ৯২টি মামলা দায়ের করেছে। এই সময়ের মধ্যে পাহাড় কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে ৭টি অভিযান পরিচালিত হয়। ক্ষতিপূরণ আদায়ের পরিমাণ ২৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা।