প্রায় অন্ধকার একটি কক্ষে দুই শিশুকে চেপে ধরে আছে কয়েকজন। অন্যরা মোটা লাঠি দিয়ে তাদের পায়ের পাতায় বেশ জোরে আঘাত করে চলেছে, আর কোনো একটা বিষয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করছে। এমন একটি ভিডিও ফুটেজ প্রচার করেছে দেশের কয়েকটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যম ও টিভি চ্যানেল। সোয়া এক মিনিটের ওই ভিডিওটি থেকে নির্যাতনের শিকার শিশু দুটির করুণ আর্তচিত্কার ভেসে আসছিল। আর শোনা যাচ্ছিল নির্যাতনকারীদের হুমকি। শিশু দুটির হাত ছিল বাঁধা, চেহারায় ছিল স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ।
রাজশাহীর পবা উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে গত শুক্রবার বিকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে জাহিদ হাসান (১৫) ও ইমন আলী (১৩) নামের দুই কিশোরকে এভাবেই নির্যাতন করা হয়। একই সময় নাটোরের বাগাতিপাড়ায় মাকুপাড়া গ্রামে দোকানে চুরির অভিযোগে তিন শিশুকে পেছনে দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে বাঁশের লাঠি দিয়ে বেদমভাবে পেটানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক জরিমানাও আদায় করেছে নির্যাতনকারীরা। নির্যাতিত এই শিশুরা হচ্ছে রুমন, মেহেদী ও ফিরোজ।
সিলেটে শিশু রাজন ও খুলনায় রাকিব হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার আদালতে বিচার শেষ হওয়ার তিন মাসের মাথায় ফের এমন নির্মম শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটল। উভয় ঘটনায় আহত শিশুদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পৃথক দুটি মামলায় গতকাল রবিবার পুলিশ ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দুজন সদস্য রয়েছেন বলেও জানা গেছে।
পবার ঘটনায় ভিডিওতে যাদেরকে মারতে দেখা গেছে তাদের মধ্যে অন্তত দুজন নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বলে অভিযোগ করেছেন নির্যাতিত শিশু জাহিদের বাবা ইমরান আলী। এ ঘটনায় ১১ জনকে অভিযুক্ত করে শনিবার বিকালেই পবা থানায় মামলা করেছেন তিনি। অভিযুক্তদের মধ্যে আজিজুল ইসলাম নামে একজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে বলে জানিয়েছেন পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম। পুলিশ ভিডিওটিও জব্দ করেছে।
অভিযুক্তদের দুজন নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে ওসি বিবিসি বাংলাকে বলেন, আমি এ সম্পর্কে মৌখিকভাবে শুনেছি। তারা দুজন ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন। দুজনেরই বাড়ি ওই এলাকায়। এ নিয়ে আমরা তদন্ত করছি। জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলেও তিনি জানান।
রাজশাহী প্রতিনিধি জানান, নির্যাতিত স্কুল ছাত্র জাহিদ হাসান চৌবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা ও বাগসারা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্র। ইমন আলী একই এলাকার মৃত মাসুদ রানার ছেলে। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর ইমান তার দাদা মকবুলের বাড়িতে থাকছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শুক্রবার সকালে চৌবাড়িয়া গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে রাকিবের একটি মোবাইল সেট চুরি হয়। ওই ফোন চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে ইমন আলীকে ধরে নিয়ে যায় রাকিব। এরপর তারা ইমনকে মারপিট করে। এ সময় ইমন মোবাইল চুরির দায় জাহিদের ওপর চাপিয়ে দেয়। দুপুর তিনটার দিকে নানার বাড়ি বিরসইল গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার সময় রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় জাহিদকে। এরপর ফজলুর বাড়ির একটি কক্ষে আটকে রেখে দুজনকে লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকেন কয়েকজন। এদের মধ্যে একজন মোবাইল ফোনে ওই নির্যাতনের দৃশ্য ধারণ করেন। একপর্যায়ে নির্যাতিতরা মোবাইল চুরিতে জড়িত থাকার কথা স্বীকার না করায় রাত ১০টার দিকে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। পরিবারের লোকজন আহত দুজনকে পবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করালেও আতঙ্কে ইমন সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
আহত জাহিদ হাসান জানায়, ‘তাকে নির্যাতনকারীদের মধ্যে নাসির উদ্দিন নামে নিরাপত্তা বাহিনীর এক লোক ছিলেন।’ তার কথার সত্যতা পাওয়া গেছে। নির্যাতনের ওই দৃশ্যে নাসিরকেও দেখা গেছে। সে হাতে লাঠি নিয়ে দুই স্কুল ছাত্রকেই বেদম প্রহার করেছেন। তবে নাসির উদ্দিন গতকাল সাংবাদিকদের কাছে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘উত্থাপিত অভিযোগ সঠিক নয়। আমি কাউকে মারিনি।’
জাহিদের বাবা ইমরান অভিযোগ করে বলেন, অভিযুক্তরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে, যেন তিনি এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য না করেন। এ ঘটনায় রাকিবসহ অন্যান্য নির্যাতনকারীরা একটি সাদা কাগজে তার স্বাক্ষর নিয়েছে। কিন্তু হুমকি উপেক্ষা করেই তিনি মামলা করেছেন।
এদিকে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে নির্যাতনকারীরা উঠেপড়ে লেগেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে। জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
নাটোর প্রতিনিধি জানান, জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার মাকুপাড়া বাজারে ব্যবসায়ী সরলের কম্পিউটারের দোকানে বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে চুরির চেষ্টা হয়। এ সময় বাজারের নৈশপ্রহরী নজরুল ইসলাম পাকা গ্রামের রমজান আলীর সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে রুমনকে আটক করে। বিষয়টি বাজার কমিটির সভাপতি ইমাজ উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমানকে জানানো হয়। বাজার কমিটির লোকজন চুরির চেষ্টায় রুমনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে রাতেই মাকুপাড়া গ্রামের আব্দুল মজিদের অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে মেহেদী ও একই গ্রামের সিদ্দিকের চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে ফিরোজকে আটক করে। পরদিন শুক্রবার বিকালে স্কুল মাঠে সালিশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই তিন শিশুকে পেছনে দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে বাঁশের লাঠি দিয়ে বেদমভাবে পেটানো হয়। এছাড়া রুমন ও মেহেদীকে তিন হাজার এবং ফিরোজকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিভাবকদের কাছ থেকে জরিমানার টাকাও নিয়ে নেয়া হয়। পরে তিনজনকেই বাগাতিপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
আহত শিশুরা অভিযোগ করেছে, রাতে বাড়িতে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় বাজার কমিটির লোকজন তাদের মাকুপাড়া বাজারে ডেকে নিয়ে যায়। এছাড়া চুরির দোষ স্বীকার করাতে প্লাস দিয়ে হাত-পায়ের নখ তুলে নেয়ার ভয় দেখিয়েছে।
এ ঘটনায় আহত শিশু ফিরোজের পিতা সিদ্দিক প্রামাণিক বাজার কমিটির সভাপতি ও সম্পাদকসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করলে পুলিশ শনিবার সকালে বাজার কমিটির সভাপতি ইমাজ উদ্দিনকে আটক করে। রবিবার দুপুরে মামলায় অভিযুক্ত অপর চারজনের মধ্যে ব্যবসায়ী শাহাকুল ইসলাম, জার্মান আলী ও নজরুল ইসলাম নাটোরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এ আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে আদালতের বিচারক মোমিনুল ইসলাম তাদের জামিন না-মঞ্জুর করে চারজনকেই কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এদিকে বাজার কমিটির সভাপতিকে আটক করার পর থেকে মাকুপাড়া বাজারের ব্যবসায়ীরা তাদের দোকান বন্ধ করে রেখেছেন। গতকাল বিকালেও বাজারের কোনো দোকান খুলতে দেখা যায়নি।