আজ বিশ্ব ঘুম দিবস। এটি দ্বাদশ। ২০০৮ সাল থেকে ইতালিতে বিশ্ব ঘুম সোসাইটি এ দিবসটি উদযাপন শুরু করে। প্রতি বছর ২১ মার্চ বিষুবরেখার উপর সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেয়, ফলে দিবারাত্রি সমান হয়। এ সময় উত্তর গোলার্ধে বসন্তকাল, তাই একে বসন্ত বিষুব বলে। বিশ্ব ঘুম দিবস বসন্ত বিষুবের আগের শুক্রবার পালিত হয়, প্রতিবছর বার ঠিক থাকে, তারিখ পাল্টে যায়। বিশ্ব ঘুম দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য—Healthy sleep, healthy ageing; বাংলায় ‘স্বাস্থ্যকর ঘুম, স্বাস্থ্যকর বয়স’। ঘুম বিশেষজ্ঞদের অভিমত, যদি একজন ব্যক্তির ঘুমের পরিমাণ ও মান সঠিক হয় তবে তাদের বয়োবৃদ্ধিও ধীরে হয়, স্বাস্থ্যসম্মত হয়। বয়োবৃদ্ধির একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন হলো ত্বকে বলিরেখা বা ভাঁজ পড়া। ঘুমের সঙ্গে ত্বকের বলিরেখার সম্পর্ক রয়েছে। সুনিদ্রা বয়োবৃদ্ধির বলিরেখাকে বিলম্বিত করে। এছাড়াও যুবক ও মধ্যবয়সীদের ঘুমের পরিমাণ ও গুণগত মান সঠিক হলে তাদের মুটিয়ে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা কমে যায়। স্নায়ু সবল ও সতেজ থাকে। মস্তিষ্ক মুক্ত থাকে ক্লান্তি ও বয়সের জরা থেকে। প্রাত্যহিক কাজের চাপ আমাদের মস্তিষ্কে যে টক্সিন বা বিষাক্ত আবহ সৃষ্টি করে, রাতের গভীর ঘুম সেসব ধুয়ে-মুছে দেয়।
অনিদ্রা ও ত্রুটিপূর্ণ নিদ্রা-অভ্যাসের কারণে আমাদের দেহের কোষে টেলোমিয়ার নামক উপাদান হূাস পায় এবং আমাদের দ্রুত বুড়ো বানিয়ে দেয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা সুনিদ্রা প্রয়োজন। শিশুদের আরও বেশি, ১০-১২ ঘণ্টা। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুম শিশুদের দৈহিক গঠন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রভাবিত করে। প্রযুক্তির কুপ্রভাব এবং সামাজিক মাধ্যমের আকর্ষণে শিশু-যুবক-বৃদ্ধ সবাই কম বেশি আক্রান্ত। আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিন এযাবত্ আশির অধিক ঘুম-সংশ্লিষ্ট রোগের বর্ণনা দিয়েছে। ২০১৪ সালে এই রোগগুলোকে ৬টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে— অনিদ্রা (ইনসমনিয়া): ঘুমের রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঘুম আসে না, কিছুক্ষণ পরই ঘুম ভেঙে যায়, সকালে যখন ঘুম আসে তখন বাচ্চাদের স্কুল ও অফিসের তাড়া। সারাদিন আলসেমি লাগে, কাজে মনোযোগ আসে না— এসব অনিদ্রার লক্ষণ।
নিদ্রাকালীন শ্বাসরোগ: নিদ্রাকালীন শ্বাসরোগের মধ্যে অব্সট্রাকিটভ স্লিপ এপনিয়া (OSA) অন্যতম। এক্ষেত্রে রোগীরা নিদ্রাকালে ভীষণ নাক ডাকে, নাক ডাকতে ডাকতে দম বন্ধ হয়ে যায়। দম বন্ধ হওয়া অবস্থায় রোগীর রক্তে অক্সিজেন স্বল্পতা দেখা দেয়। উচ্চ রক্তচাপ, হূদরোগ, বহুমূত্র ইত্যাদি রোগকে স্লিপ এপনিয়া রোগের সহোদর হিসেবে দেখা হয়। এই রোগীরা সারাদিন তন্দ্রায় থাকে— অফিসে, স্কুলে মনোযোগ থাকে না। দিনে দিনে কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়।
অতিরিক্ত ঘুমের প্রবণতা বা হাইপারসমনিয়া: এটি একটি স্নায়ুর রোগ যেখানে রোগীরা কর্মক্ষেত্রে তীব্র ঘুমে আক্রান্ত হয়। হয়ত টেলিফোনে কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে গেলেন; অপর প্রান্তের ব্যক্তি হ্যালো হ্যালো করেই যাচ্ছেন। মাঠে খেলছেন ঘুমিয়ে গেলেন, কখনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলছেন।
ঘুমের ছন্দে পরিবর্তন: ঘুম একটি ছন্দময় ঘটনা। দিনের ক্লান্তিশেষে রাতের নিরবচ্ছিন্ন ঘুম। সকালে নতুন কর্মময় দিন। এই ছন্দে পতন ঘটলে সহজে আর ছন্দ ফিরে আসে না। রোগীরা দিনের পর দিন ঘুমের ঔষধ খেয়ে যায় ঔষধের মাত্রা বাড়ে, নিদ্রা বাড়ে না। এ সমস্যা এখন প্রকট। ফেসবুক, ইন্টারনেট, টকশো ইত্যাদি আমাদের নিদ্রাদেবীকে প্রতিনিয়ত ছন্দহীন করে তুলছে।
প্যারাসমনিয়া বা নিদ্রাকালে রোগীর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ: যেমন ঘুমে কথা বলা বা বোবা ধরা, ঘুমিয়ে হাঁটা, খাওয়া, দেয়ালে ঘুষি মারা। এমনকি ঘুমের মধ্যে কাউকে হত্যা করার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
নিদ্রাকালীন অঙ্গ সঞ্চালন: ঘুমিয়ে হাতপা ছোড়া। অনেক সময় স্ত্রী অভিযোগ করেন যে স্বামী তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় পদাঘাত করেন। সেখান থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়। সারাবিশ্বে ৪৫% মানুষ কোনো না কোনো ঘুমের রোগে ভুগছেন। অধিকাংশ রোগী, এমনকি চিকিত্সকরাও এ রোগগুলো সম্পর্কে সচেতন নন। আমাদের দেশেও পাশ্চাত্যের লাইফস্টাইল, খাদ্যাভ্যাস কমবেশি ঘুমের রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঘুমের রোগ নির্ণয়ে যে স্লিপ ল্যাবরেটরি ব্যবহূত হয় তা ২৩ জুন ২০০৫ সালে জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই থেকে বাংলাদেশে ঘুমের রোগের চিকিত্সার সূচনা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সচেতনতার জন্য বিশ্ব ঘুম দিবস পালনের মাধ্যমে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ঘুমের রোগ নিয়ে আলোচনা খুবই জরুরি। বিশ্ব ঘুম দিবসে সকলের সুনিদ্রার জন্য কিছু পরামর্শ থাকলো:
১. ঘুমের জন্য সময় নির্দিষ্ট করুন, ধরুন রাত ১২টা থেকে সকাল ৭ টা। ২. দিবানিদ্রা যেন ৪৫ মিনিটের বেশি না হয়। ৩. ঘুমানোর ৬ ঘণ্টা পূর্বে চা, কফি পান নিষেধ। ৪. ঘুমানোর ৪ ঘণ্টা আগে থেকে মিষ্টি ও মশলা জাতীয় ভূরিভোজন নিষেধ। ৫. নিয়মিত ব্যায়াম করুন, কিন্তু ঘুমানোর ঠিক পূর্বে নয়। ৬. বিছানা আরামদায়ক করুন। ৭. শয়ন কক্ষে টেলিফোন ও টেলিভিশন নিষেধ। ৮. ঘুমের কক্ষটি হবে পর্যাপ্ত বায়ুবাহিত, শান্ত ও আলোকবর্জিত, শুধু ঘুম ও সম্ভোগের জন্য নির্দিষ্ট।
n লেখক: প্রফেসর এবং চেয়ারম্যান, রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ধী