চট্টগ্রামে লাইসেন্স ছাড়াই চলছে স্বর্ণ বন্ধকী ব্যবসা

চট্টগ্রামের নগর ও উপজেলাগুলোতে জুয়েলারি (স্বর্ণ) ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ১০ হাজার। এদের অধিকাংশই জুয়েলারি ব্যবসার পাশাপাশি স্বর্ণ বন্ধক রেখে গ্রাহকদের কাছে চড়াসুদে অর্থলগ্নি করে। যুগ যুগ ধরে অর্থলগ্নির এই ব্যবসা চলে আসলেও এদের অধিকাংশেরই কোনো লাইসেন্স নেই। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগের পরও এসব ব্যবসায়ী লাইসেন্স নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এর ফলে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে লেনদেন করছে গ্রাহকরা, সরকারও বঞ্চিত হচ্ছে বড় অংকের রাজস্ব থেকে।

 
মানি লেন্ডার এ্যাক্ট ১৯৪০-এর বিধান অনুযায়ী জুয়েলারি ব্যবসার সঙ্গে স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে সুদের বিনিময়ে অর্থলগ্নি করলে জেলা প্রশাসকের আরএম (রেভিন্যু মুন্সিখানা) শাখা থেকে মানি লেন্ডিং লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু এখানকার প্রায় দশ হাজার স্বর্ণ ব্যবসায়ীর মধ্যে মানি লেন্ডিং লাইসেন্স আছে মাত্র ২৯২ জন ব্যবসায়ীর। বাকিরা লাইসেন্স না নিয়েই জুয়েলারি ব্যবসার অন্তরালে অর্থলগ্নি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
 
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন বলছে, যেসব ব্যবসায়ী লাইসেন্স নিয়ে অর্থলগ্নি ব্যবসা করছে তারা বেশিরভাগই শহর এলাকার। উপজেলা এলাকার লাইসেন্স নেয়ার প্রবণতা খুব কম। অথচ উপজেলা পর্যায়েই এই ব্যবসা বেশি প্রচলিত। অন্য উপজেলাগুলোতে দু’চারজন করে মানি লেন্ডিং লাইসেন্স নিলেও দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে এখনো পর্যন্ত একজন ব্যবসায়ীরও এই লাইসেন্স নেই।
 
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমিন ইত্তেফাককে বলেন, স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা লাইসেন্সের আওতায় না থাকায় প্রত্যক্ষভাবে লাইসেন্স ফি ও পরোক্ষভাবে মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। তাই সমপ্রতি লাইসেন্সের আওতায় আনতে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করে তাদের কাছে নোটিস দিয়ে লাইসেন্স গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লাইসেন্স গ্রহণ না করলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
 
বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির তথ্যমতে, চট্টগ্রাম নগরের ৪১ ওয়ার্ড ও ১৪ উপজেলায় ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় আকারের প্রায় ১০ হাজার স্বর্ণ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরে প্রায় পাঁচ হাজার ও উপজেলাগুলোতে আছে বাকি পাঁচ হাজার স্বর্ণ ব্যবসায়ী। এসব ব্যবসায়ীর অধিকাংশই স্বর্ণ ব্যবসার পাশাপাশি স্বর্ণ বন্ধক রাখার বিনিময়ে অর্থলগ্নি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে কিছু কিছু জুয়েলারি ব্যবসায়ী অর্থলগ্নির সঙ্গে জড়িত নয়, তারা শুধুমাত্র জুয়েলারি ব্যবসা করে থাকেন।
 
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক স্বপন চৌধুরী ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের যথাযথ মনিটরিং ও উদ্যোগের অভাবে ব্যবসায়ীরা এই সুযোগ পাচ্ছে। এতে কয়েক হাজার ব্যবসায়ী ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দিতে পারছে। এতে ব্যবসায়ীদের মাঝে অসম প্রতিযোগিতাও তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রাহকরাও অনিরাপদ লেনদেন করতে বাধ্য হচ্ছে।
 
চট্টগ্রাম নগরীতে দীর্ঘদিন ধরে জুয়েলারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত পার্থ সারথি চৌধুরী (টুনটুন) ইত্তেফাককে বলেন, যুগ যুগ ধরে সারাদেশের ন্যায় চট্টগ্রাম ও আশ-পাশের এলাকাগুলোতে স্বর্ণ বন্ধক রেখে অর্থলগ্নির এই ব্যবসা চলে আসছে। মানুষ নিজেদের আর্থিক প্রয়োজনে অলংকার বন্ধক রেখে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নগদ টাকা নেয়। মেয়াদ শেষে সেই টাকা সুদসহ পরিশোধ করলে তার অলংকার ফেরত দেয়া হয়।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্থলগ্নির এই ব্যবসায়ের লেনদেন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে শহর ও গ্রামাঞ্চলে নানা অভিযোগ উঠে। অনেক সময় কোনো ধরনের রশিদ কিংবা ডক্যুমেন্ট ছাড়াই লেনদেন হয়। ফলে পরবর্তীতে এসব লেনদেন নিয়ে আর্থিক জটিলতা তৈরি হয়।
 
শুধু যে মানি লেন্ডিং লাইসেন্স নেই তা নয়; অনেক ব্যবসায়ীর জুয়েলারি ব্যবসার অনুমোদন অর্থাত্ গোল্ড ডিলিং লাইসেন্সও নেই। স্বর্ণ ব্যবসা করতে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৫৬-এর বিধান অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের ব্যবসা-বাণিজ্য শাখা থেকে গোল্ড ডিলিং লাইসেন্স নেয়ার বিধান থাকলেও চট্টগ্রামের ১০ হাজার স্বর্ণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ডিলিং লাইসেন্স আছে মাত্র এক হাজার ৬৬৩টি প্রতিষ্ঠানের। বাকি প্রায় আট হাজার ৩৩৭ প্রতিষ্ঠান এখনো লাইসেন্সবিহীন।
 
জেলা প্রশাসন বলছে, গোল্ড ডিলিং লাইসেন্স ফি নিতে খরচ হয় ১ হাজার, আর প্রতিবছর নবায়ন করতে খরচ হয় ৩ হাজার টাকা। যাদের এই লাইসেন্স আছে তারা ভ্যাট ও আয়করের মাধ্যমেও সরকারকে রাজস্ব দিতে বাধ্য। সে হিসেবে প্রতি বছর এই খাত থেকে অন্তত সাড়ে চার কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
 
বিষয়টি স্বীকার করে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি চট্টগ্রাম’র সভাপতি মৃণাল কান্তি ধর বলেন, অনেক ব্যবসায়ী ভ্যাট ও আয়কর মিলে ১৫ শতাংশ নিয়মিত কর দিলেও বেশিরভাগই দেন না। অনেক ব্যবসায়ীর অনুমোদনপত্রও (লাইসেন্স) নেই। বিষয়টি সমিতির পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। এমনকি কেনা-বেচায় নীতিমালা না থাকায় সাধারণ ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।