ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ফল বাতিলের দাবিতে ছাত্রলীগ ছাড়া সব ছাত্র সংগঠন একাট্টা। পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ছাত্র-সংগঠনগুলো। সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সাত শিক্ষার্থী এবং রোকেয়া হলের সামনে হল সংসদের পুনঃনির্বাচন ও প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে ধারাবাহিকভাবে অনশনে আছেন পাঁচ ছাত্রী। দাবি না মানা পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অনশনকারীরা। এদিকে, বুধবার মধ্যরাতে রোকেয়া হলের সামনে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অনশনে বসা শিক্ষার্থীদের হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে। রোকেয়া হলের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছেন নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর ও ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান। একইসঙ্গে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জিনাত হুদার পদত্যাগ ও নারী হেনস্তার বিচার দাবি করেছেন তারা।
‘প্রশ্নবিদ্ধ’ ডাকসু নির্বাচনের ফল বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদভুক্ত ছাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বিসিএল), জাসদ ছাত্রলীগ (ইনু) ও বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে সংগঠনগুলো। একই দাবিতে বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন ও বাংলাদেশ ছাত্র সমিতিও স্মারকলিপি দিতে যাচ্ছে। এদিকে ফল ঘোষণার পরদিন থেকেই আন্দোলন করে আসছে ছাত্রদল, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, প্রগতিশীল ছাত্র জোট, স্বতন্ত্র জোটসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দাবি মানতে তিন দিনের আল্টিমেটামও দিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে জাসদ ছাত্রলীগ (ইনু) সভাপতি আহসান হাবীব শামীম বলেন, এটা একটা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন। এ ধরনের নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চায়নি। এ নির্বাচন আয়োজনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীরা আস্থা হারিয়েছে। তাই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে আমরা উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিয়েছি। আশা করব, তিনি আমাদের দাবি মেনে নিবেন।
আমরণ অনশন অব্যাহত শিক্ষার্থীদের: রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সাত শিক্ষার্থী অনশন অব্যাহত রেখেছেন। এ বিষয়ে আল মাহমুদ তাহা বলেন, যেভাবে নির্বাচনে কারচুপি করা হয়েছে সেটা ডাকসুর ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই পুনরায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছি। পুনরায় নির্বাচন না দেওয়া পর্যন্ত আমাদের আমরণ অনশন চলবে।গতকাল সকালে এ অনশনে যোগ দেন অন্ধ শিক্ষার্থী আমজাদ হোসেন। আর অসুস্থ হয়ে পড়ায় অনশনকারী অনিন্দ্য মণ্ডলকে হলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, কারচুপির অভিযোগে রোকেয়া হল সংসদ নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন, হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগসহ চার দফা দাবিতে বুধবার রাত নয়টা থেকে আমরণ অনশনে বসা হলের পাঁচ শিক্ষার্থীই তাদের অনশন অব্যাহত রেখেছেন।
ছাত্রীদের অনশনে নুরের সংহতি: পুনরায় নির্বাচন ও প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে অনশনে বসা পাঁচ অনশনকারীর সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন ডাকসুর নব-নির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর। একইসঙ্গে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জিনাত হুদার পদত্যাগ ও নারী হেনস্তার বিচার দাবি করেন তিনি। গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে নুরুল হক নুর বলেন, শিক্ষার্থীরা যে দাবিতে অনশন করছে তার সঙ্গে আমি সংহতি প্রকাশ করছি। পরে দুপুর দুইটার দিকে সংহতি জানাতে আসেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ডাকসুর সহসভাপতি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদেরকে আমরা সবসময় শ্রদ্ধা করি। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ছাত্রদল সবসময় সোচ্চার ছিল। আগামীতেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থাকবে।
অনশনকারী ছাত্রীদের ছাত্রলীগের হেনস্তা:অনিয়ম-কারচুপির অভিযোগ এনে হল সংসদে ফের নির্বাচনের দাবিতে আমরণ অনশনে বসা ছাত্রীদের হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। ছাত্রীদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও ডাকসুর নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) গোলাম রাব্বানী নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে তাদের হেনস্তা করেন। অনশনকারী শ্রবণা শফিক দীপ্তি বলেন, বুধবার রাতে গোলাম রাব্বানী তার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে এখানে এসে আমাদের, সমর্থনকারীদের হেনস্তা করেন। ছবি দেখিয়ে একজনকে চরিত্রহীন প্রমাণের চেষ্টা করেন। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, আমরা মদ-গাঁজা খেয়ে আন্দোলন করছি। এ ছাড়া আমাদের চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের জন্য প্রক্টরকে বলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীসূত্রে জানা যায়, দিবাগত রাত দেড়টার দিকে মোটরসাইকেলে করে ছাত্রলীগ শতাধিক নেতা-কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে রোকেয়া হলের সামনে আসেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও ডাকসুর নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) গোলাম রাব্বানী। তিনি টেলিফোনে প্রক্টরকে জানান, হলের কিছু মেয়ে মধ্যরাতে গেট খুলে বাইরে অবস্থান করে অন্য শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছেন। তিনি বলেন, এরা খুব বাড়াবাড়ি করছে, স্যার। এদের সবগুলোর ফাইল দেখে চিহ্নিত করে, গার্ডিয়ান ডেকে এনে স্থায়ীভাবে একাডেমিক বহিষ্কার করেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খোদা হাফেজ করে দেন। অনশন করা মেয়েদেরকে ‘শিবিরের ছাত্রী সংস্থার মেয়ে’ ‘মদ-গাঁজা খেয়ে আন্দোলন করছে’ বলে অভিহিত করেন। পরবর্তীতে তিনি চলে যাওয়ার পর তার সঙ্গে থাকা ছাত্রলীগ কর্মীরা মোটর সাইকেল নিয়ে শোডাউন দেন।
এ ব্যাপারে প্রাধ্যক্ষ জিনাত হুদা বলেছেন, এ ঘটনার বিষয়ে আমি অবগত না। কোনো হাউস টিউটরও আমাকে অবগত করেননি। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে জিনাত হুদা এ কথা বলেন। অধ্যাপক জিনাত হুদা সাংবাদিকদের বলেন, রোকেয়া হল সংসদ নির্বাচনে কোনো কারচুপি হয়নি। এমনকি ব্যালট বক্স লুকিয়ে রাখার কোনো ঘটনাও ঘটেনি। যে তিনটি ব্যালট বক্স পাওয়া গেছে তা বুথের মধ্যেই ছিল।